৩,৪৯৯ ডলার দিয়ে আপনি কি একটা হেডসেট কিনবেন — শুধু এই আশায় যে সেটা আপনার কম্পিউটিং অভিজ্ঞতা বদলে দেবে? বেশিরভাগ মানুষের উত্তর হবে ‘না’, আর ঠিক এই প্রশ্নের সামনেই অ্যাপল নিজেকে দাঁড় করিয়েছিল ২০২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। ২০২৩ সালের ৫ জুন WWDC মঞ্চে টিম কুক যখন Vision Pro উন্মোচন করেছিলেন, তখনই বোঝা গিয়েছিল এটা অ্যাপলের এক দশকের সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী পণ্য। আট মাস পর যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি শুরু হলো, আর এখন, দুই বছর পর দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা করার সময় এসেছে — এই দামি পরীক্ষা-নিরীক্ষা কি সত্যিই সফল?

প্রথমেই একটা জিনিস পরিষ্কার করা দরকার — অ্যাপল নিজেই Vision Pro-কে VR বা AR হেডসেট বলতে রাজি নয়। তাদের ভাষায় এটা একটা “স্পেশিয়াল কম্পিউটারস্পেশিয়াল কম্পিউটারডিজিটাল কনটেন্টকে বাস্তব জগতের সাথে মিশিয়ে ত্রিমাত্রিক পরিসরে উপস্থাপনকারী কম্পিউটিং প্রযুক্তি” — যেখানে অ্যাপ, ভিডিও ও কাজ থ্রি-ডি স্পেসে ভেসে বেড়ায়, চোখ ও হাতের ইশারায় নিয়ন্ত্রিত হয়। এই নামকরণটাই বলে দেয় অ্যাপলের উচ্চাকাঙ্ক্ষা — তারা গেমিং ডিভাইস বানাতে চায়নি, বানাতে চেয়েছে ভবিষ্যতের কম্পিউটার।

হার্ডওয়্যার সত্যিই অভূতপূর্ব, কিন্তু তার দাম কে দিচ্ছে?

Vision Pro চলে দুটি চিপে — M2 প্রসেসর এবং R1 নামে একটা বিশেষ সেন্সর-ফিউশন চিপসেন্সর-ফিউশন চিপএকাধিক সেন্সরের ডেটা একত্রিত করে দ্রুত ও নির্ভুল তথ্যে রূপান্তরকারী চিপ, যেটা ১২টি ক্যামেরা, ৫টি সেন্সর ও ৬টি মাইক্রোফোনের সংকেত মাত্র ১২ মিলিসেকেন্ডে প্রসেস করে “photon-to-photonphoton-to-photonবাস্তব দৃশ্যের আলো ক্যামেরায় ধরা পড়া থেকে স্ক্রিনে প্রদর্শিত হওয়া পর্যন্ত সময়ের বিলম্ব” ল্যাটেন্সি সম্ভব করে। দুটি মাইক্রো-OLEDমাইক্রো-OLEDঅতি ক্ষুদ্র পিক্সেল ঘনত্বের উচ্চমানের ডিসপ্লে প্রযুক্তি, যা তীক্ষ্ণ ছবি দেয় স্ক্রিনে মোট পিক্সেলসংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৩০ লক্ষ — একটা 4K টিভির চেয়েও বেশি। এই সংখ্যাগুলো শুনতে ইঞ্জিনিয়ারিং বিস্ময় মনে হয়, আর আসলেই তাই। কিন্তু সবচেয়ে আলোচিত ফিচার EyeSight — যখন কেউ হেডসেট পরে আপনার সঙ্গে কথা বলছে, বাইরের ডিসপ্লেতে তার চোখ ভেসে ওঠে, যাতে সামাজিক যোগাযোগটা একেবারে বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায়। ভালো আইডিয়া, কিন্তু বাস্তবতাটা কঠোর — ব্যাটারি মাত্র ২ থেকে আড়াই ঘণ্টা, ওজনও যথেষ্ট, আর দীর্ঘ ব্যবহারে অস্বস্তির অভিযোগ উঠেছে অসংখ্য ব্যবহারকারীর কাছ থেকে। প্রযুক্তি যতই চমকপ্রদ হোক, একটা ডিভাইস যদি মাথায় পরে আরাম না দেয়, সেটা দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায়।

শুরুর উচ্ছ্বাস কেন এত দ্রুত মিলিয়ে গেল?

প্রথম কয়েক সপ্তাহে প্রবল চাহিদা দেখা গেলেও অনেক ক্রেতা পণ্য ফেরত দিয়েছেন — আরাম, মাথাব্যথা ও সীমিত অ্যাপ লাইব্রেরির অভিযোগে। ২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিকে বিশ্বব্যাপী প্রায় ২ লাখ ইউনিট বিক্রি হয়েছে বলে বাজার বিশ্লেষকদের অনুমান — একটা অ্যাপল পণ্যের জন্য এই সংখ্যা বিব্রতকরভাবে কম। জুলাই ২০২৪-এ Bloomberg-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অ্যাপল Vision Pro-এর উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে Vision Pro 2 পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর ২০২৬ সালের জন্য লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে তুলনামূলক কম দামের একটা “Vision” হেডসেটকে। আমার কাছে এই সিদ্ধান্তটাই আসল ইঙ্গিত — অ্যাপল নিজেই স্বীকার করে নিয়েছে যে ৩,৪৯৯ ডলারের সংস্করণ দিয়ে গণমানুষের বাজার জয় করা সম্ভব নয়।

আন্তর্জাতিক রোলআউট এত ধীর হলো কেন?

শুরুতে শুধু যুক্তরাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ থাকলেও জুন ২০২৪ থেকে Vision Pro বাজারে আসে চীন, জাপান ও সিঙ্গাপুরে। জুলাই ২০২৪-এ যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডাতেও বিক্রি শুরু হয়। এই ধীর, ধাপে ধাপে বিস্তার নিজেই বলে দেয় অ্যাপল খুব সতর্কভাবে চাহিদা পরিমাপ করছিল। মূলত ডেভেলপার, বিলাসী গ্যাজেট-প্রেমী ও এন্টারপ্রাইজ গ্রাহকই এর মূল ক্রেতা — সাধারণ ভোক্তা এখনো এই তালিকায় নেই, আর আমার মতে সেটাই এই ডিভাইসের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা।

Meta Quest ৩-এর সঙ্গে তুলনাটা আসলে অসম

Vision Pro-এর সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী Meta Quest 3, যার দাম মাত্র ৪৯৯ ডলার — অর্থাৎ Vision Pro-এর এক-সপ্তমাংশেরও কম। Quest 3 গেমিং-কেন্দ্রিক, বৃহৎ অ্যাপ ও গেম লাইব্রেরি আছে, আর সাধারণ ভোক্তার জন্য বাস্তবসম্মত দাম রাখে। তুলনার মূল বৈশিষ্ট্যগুলো দেখুন:

  • দাম: Vision Pro ৩,৪৯৯ ডলার বনাম Quest 3 ৪৯৯ ডলার
  • ডিসপ্লে: Vision Pro-এর মাইক্রো-OLED তীক্ষ্ণতায় এগিয়ে
  • ইকোসিস্টেম: Quest 3 গেমিং-এ, Vision Pro প্রোডাক্টিভিটি/মিডিয়া ব্যবহারে

এই তুলনাটা আসলে দুটো ভিন্ন দর্শনের লড়াই — একদিকে গণমানুষের জন্য সাশ্রয়ী বিনোদন, অন্যদিকে সীমিত মানুষের জন্য প্রিমিয়াম উৎপাদনশীলতা। দুটোই ন্যায্য কৌশল, কিন্তু বাজারের আকার বলে দিচ্ছে কোনটা এগিয়ে।

বাংলাদেশের AR/VR শিল্পের জন্য এখান থেকে কী শেখার আছে?

বাংলাদেশে Vision Pro আনুষ্ঠানিকভাবে পাওয়া যায় না; দু-একজন টেক-এনথুজিয়াস্ট দুবাই বা সিঙ্গাপুর থেকে আমদানি করেছেন বলে শোনা যায়। তবে দেশের AR/VR সেক্টর এই বাজারের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, আর সেটাই বুদ্ধিমানের কাজ। ঢাকা ও চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটা স্টার্টআপ ইতিমধ্যে শিক্ষামূলক VR, রিয়েল-এস্টেট ভার্চুয়াল ট্যুর এবং চিকিৎসা প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে Meta Quest প্ল্যাটফর্মে কাজ করছে — অর্থাৎ আমরা প্রান্তিক অথচ বাস্তবসম্মত পথটাই বেছে নিয়েছি, ব্যয়বহুল প্রিমিয়াম পথ নয়। আমার মতে এটাই ঠিক সিদ্ধান্ত।

তবু Vision Pro-এর সাফল্য-ব্যর্থতার পাঠ বাংলাদেশি ডেভেলপারদের জন্য উপেক্ষা করার মতো নয় — কারণ যদি অ্যাপল ২০২৬-এ কম দামি সংস্করণ বাজারে আনে, visionOS-এর জন্য অ্যাপ তৈরির দক্ষতা একটা নতুন রপ্তানিমুখী সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। যারা এখনই এই প্ল্যাটফর্মে হাত পাকাচ্ছেন, তারা কয়েক বছর পর অগ্রগামী হিসেবে দাঁড়াতে পারবেন।

অ্যাপল Vision Pro আপাতত বাণিজ্যিক হিট নয় — এটা স্বীকার করে নেওয়াই ভালো। কিন্তু আমার চোখে এটা একটা প্রযুক্তিগত বাতিঘর। iPhone-এর প্রথম প্রজন্মও একদিনে পৃথিবী বদলায়নি; সেটা হয়েছিল কয়েক বছর পর App Store-এর মাধ্যমে। স্পেশিয়াল কম্পিউটিং সত্যিই মূলধারায় আসবে কি না, তার উত্তর আগামী তিন-চার বছরেই স্পষ্ট হবে — আর ততদিন পর্যন্ত ধৈর্য ধরে দেখাটাই আমাদের করণীয়।