১১ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করার পর থেকেই একটি সংখ্যা ঘুরছে: ৫০০ কোটি টাকা। কোথাও একে বলা হচ্ছে এআই তহবিল, কোথাও স্টার্টআপ তহবিল। ভ্যাট নিয়েও নানা কথা শোনা যাচ্ছে। তাই এই লেখায় আমরা সংবাদ শিরোনামের সঙ্গে বাজেট বক্তৃতার মূল পাঠ মিলিয়ে দেখেছি।
শুরুতে একটি কথা মনে রাখুন। বাজেট বক্তৃতা হলো প্রস্তাব। অর্থবিল সংসদে পাস হওয়ার আগে এর কিছু অংশ বদলাতে পারে। আর করের অনেক খুঁটিনাটি থাকে অর্থবিল ও পরবর্তী প্রজ্ঞাপনে, বক্তৃতায় সব থাকে না।
৫০০ কোটি টাকা: এআই তহবিল, না স্টার্টআপ তহবিল?
বাজেট বক্তৃতার ১৭৪ অনুচ্ছেদে অর্থমন্ত্রী তথ্যপ্রযুক্তি খাতের নতুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেন। বলা হয়েছে, এটি ব্যবহার হবে একটি স্টার্টআপ ফান্ড হিসেবে, যা নারী উদ্যোক্তা, নারীর অগ্রগতি ও তরুণ উদ্যোক্তাদের বিকাশে সহায়তা করবে।
লক্ষ করুন, ওই অনুচ্ছেদে এআই শব্দটি নেই। অনুচ্ছেদটি অবশ্য এআই, ইলেকট্রনিক্স ও তরুণ উদ্যোক্তা উন্নয়ন শিরোনামের অংশের ভেতরে পড়ে, আর ঢাকা ট্রিবিউনসহ কিছু প্রতিবেদনে তহবিলটিকে এআইভিত্তিক উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখানো হয়েছে। তাই এআই স্টার্টআপ এখান থেকে সুবিধা পেতে পারে, তবে একে বিশেষভাবে এআই তহবিল বলা বক্তৃতার ভাষার চেয়ে বেশি দাবি করা হয়। তহবিলটি কে চালাবে, কে আবেদন করতে পারবে, ঋণ না অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে, এসব বক্তৃতায় বলা নেই। একই বক্তৃতার ১৭৩ অনুচ্ছেদ বলছে, বিভিন্ন স্টার্টআপ তহবিলকে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং একটি নতুন স্টার্টআপ নীতি তৈরির কাজ চলছে।
আরেকটি বিভ্রান্তি আছে। বাজেটের আগের দিন ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে ক্রিয়েটিভ ইকোনমির জন্য ৫০০ কোটি টাকার কথা ছিল, যার ২০০ কোটি সরকার আর ৩০০ কোটি বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে আসবে। কিন্তু চূড়ান্ত বক্তৃতার ১৯৪ অনুচ্ছেদের অঙ্ক ভিন্ন: ক্রিয়েটিভ ইকোনমির জন্য শুরুতে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ, এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর খাত থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহ। অর্থাৎ স্টার্টআপ ফান্ডের ৫০০ কোটি আর সিএসআরের ৫০০ কোটি দুটি আলাদা অনুচ্ছেদের আলাদা বিষয়। এগুলোকে এক করে দেখলে ভুল হবে।
ভ্যাট: ডিজিটাল সেবায় নতুন কর, না ছাড়?
বক্তৃতায় ডিজিটাল অর্থনীতি নিয়ে ভ্যাটের যে অংশ আছে, তার শিরোনামই ভ্যাট অব্যাহতি। ২৭১ ও ২৭২ অনুচ্ছেদের প্রস্তাবগুলো হলো:
- নিবন্ধিত স্টার্টআপের দেওয়া সেবায় ১৫ শতাংশ ভ্যাট থেকে পূর্ণ অব্যাহতি।
- স্টার্টআপের ব্যবহৃত আমদানি করা সেবায় ১৫ শতাংশ ভ্যাট থেকে অব্যাহতি। বিদেশি ক্লাউড বা সফটওয়্যার সেবা ব্যবহারকারীদের জন্য এটি কাজে আসতে পারে।
- স্টার্টআপের ব্যবহৃত প্রাঙ্গণ ও সুবিধা ভাড়ায় ১৫ শতাংশ ভ্যাট থেকে অব্যাহতি।
- কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের সেবায় ১৫ শতাংশ ভ্যাট থেকে পূর্ণ অব্যাহতি।
স্টার্টআপের তিনটি ছাড় ৩০ জুন ২০৩৫ পর্যন্ত থাকবে বলে প্রস্তাব করা হয়েছে। নিবন্ধিত বলতে কোন নিবন্ধন বোঝানো হচ্ছে, বক্তৃতার এই অংশ তা ব্যাখ্যা করে না।
তবে বক্তৃতায় নতুন ডিজিটাল ভ্যাট না থাকার মানে এই নয় যে অর্থবিলেও কিছু নেই। অনলাইন বিজ্ঞাপন বা স্ট্রিমিং সেবার মতো বিষয়ে কী হচ্ছে, তা জানতে অর্থবিলের ধারা মিলিয়ে দেখা দরকার। আবার একটি জায়গায় ছাড়ের পাশে নতুন করও আছে। প্রতিটি সিমের ওপর ৩০০ টাকার নির্দিষ্ট কর পুরো প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী, আর এতে প্রায় ১,২০০ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির কথা বলেছেন। কিন্তু দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে, এর জায়গায় সিম বিক্রির দামের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট বসবে, যা বক্তৃতার ওই অনুচ্ছেদে উল্লেখ নেই।
কর ছাড়ের বাকি অংশ: কারা উপকৃত হতে পারেন
ভ্যাটের বাইরে আয়কর ও শুল্কের কয়েকটি প্রস্তাব শিক্ষার্থী, ফ্রিল্যান্সার ও উদ্যোক্তাদের সরাসরি ছুঁয়ে যায়।
- ফ্রিল্যান্সিং আয়: এখন শুধু আইটি ফ্রিল্যান্সিং আয়ে কর অব্যাহতি আছে। প্রস্তাব হলো সব ধরনের ফ্রিল্যান্সিং আয়ে তা বাড়ানো।
- কনটেন্ট তৈরি: কনটেন্ট তৈরি থেকে আসা সব আয় পুরোপুরি আয়করমুক্ত করার প্রস্তাব।
- টার্নওভার কর: তরুণ উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ, উদ্ভাবনী ও প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসায় শূন্য শতাংশ। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে ০.১ শতাংশ লেখা হলেও বক্তৃতায় আছে শূন্য। ডেইলি স্টারের বিশ্লেষণে এর মেয়াদ ৩০ জুন ২০৩৫ পর্যন্ত বলা হয়েছে।
- কম্পিউটার: ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, প্রিন্টার ও মনিটরে আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট পুরো প্রত্যাহারের প্রস্তাব। এসএসডিতে ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক থাকছে।
- দেশীয় উৎপাদন: মোবাইল ফোন, কম্পিউটার ও ডিজিটাল ডিভাইস তৈরির কাঁচামাল ও উপকরণে শুল্ক অব্যাহতি ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব। সেমিকন্ডাক্টর নকশা, পরীক্ষা ও প্যাকেজিংয়েও বিশেষ সুবিধা আছে।
- ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা: বছরে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভারের আয় করমুক্ত করার প্রস্তাব। নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের জন্য সীমা ৭০ লাখ টাকা।
- পস মেশিন: আমদানি শুল্ক ১০ থেকে ৫ শতাংশে নামানো এবং ৭.৫ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহার।
এখানেও শিরোনাম আর মূল পাঠে পার্থক্য আছে। কিছু প্রতিবেদনে সার্ভারের ওপরও শুল্ক উঠে যাওয়ার কথা আছে, কিন্তু বক্তৃতার এই অংশে সার্ভারের নাম আমরা পাইনি। পস মেশিনের শুল্ক শূন্য হওয়ার কথাও ছাপা হয়েছে, অথচ বক্তৃতায় আছে ৫ শতাংশ। তাই ব্যবসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন দেখে নেওয়া ভালো।
এই প্রস্তাবগুলোর সঙ্গে ২৮০ অনুচ্ছেদের একটি অঙ্গীকারও মিলিয়ে পড়া যায়। সেখানে সম্পূর্ণ ডিজিটাল সিঙ্গেল উইন্ডো চালুর কথা বলা হয়েছে, যেখানে পূর্ণাঙ্গ আবেদন পাওয়ার পর সেবা সর্বোচ্চ সাত দিনের মধ্যে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আছে। উদ্যোক্তাদের জন্য অনেক সময় করের চেয়েও বড় বাধা হয় অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা। কাজেই এই অঙ্গীকার মানা হয় কি না, সেটিও নজর রাখার মতো।
বড় লক্ষ্য, ছোট বরাদ্দ?
বক্তৃতার ১৬৮ অনুচ্ছেদ বলছে, জিডিপিতে আইসিটি ও টেলিযোগাযোগ খাতের অবদান এখন মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ, আর পরিকল্পনা হলো পাঁচ বছরে তা ১০ শতাংশে তোলা। ৫জি কভারেজ ৯০ শতাংশ মানুষের কাছে নেওয়া এবং ১০০ এমবিপিএস ব্রডব্যান্ড নিশ্চিত করার লক্ষ্যও আছে। এক নাগরিক, এক আইডি, এক ডিজিটাল ওয়ালেট ধারণাটি বাস্তবায়নের উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে। শিক্ষায় এক শিক্ষক, এক ট্যাব কর্মসূচি ও ফ্রি ওয়াই-ফাই সম্প্রসারণের প্রস্তাব আছে।
এআই নিয়ে ১৭১ অনুচ্ছেদ মূলত দিকনির্দেশনামূলক। সরকারি সেবা, স্মার্ট সিটি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিতে এআই ব্যবহারের কথা আছে। তবে ওই অনুচ্ছেদে কোনো নির্দিষ্ট বরাদ্দ বা জাতীয় এআই নীতির সময়সীমা দেওয়া হয়নি।
অর্থায়নের অঙ্ক দেখলে প্রশ্নটি স্পষ্ট হয়। বেসিসের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর ঢাকা ট্রিবিউনে লিখেছেন, আইসিটি বিভাগের জন্য বরাদ্দ ২,০৪৯ কোটি টাকা এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের জন্য ২,১৪১ কোটি টাকা। প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার মোট বাজেটের তুলনায় দুটি মিলিয়েও এক শতাংশের কম। তাঁর সমালোচনাও লক্ষণীয়: শুল্কমুক্ত আমদানি দেশীয় সংযোজনকারীদের চাপে ফেলতে পারে, রাজস্ব কমলে আইটি খাতে নিরীক্ষার কড়াকড়ি বাড়তে পারে, আর নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের নিশ্চয়তা ছাড়া সাশ্রয় হারিয়ে যেতে পারে। এগুলো তাঁর মতামত।
বিনিয়োগকারীদের একাংশ অবশ্য আশাবাদী। ডেইলি স্টারের বিশ্লেষণে আইডিএলসি ভেঞ্চার ক্যাপিটালের মুস্তাফিজুর আর খান টার্নওভার করকে প্রাথমিক পর্যায়ের কোম্পানির জন্য নীরব ঘাতক বলেছেন। একই লেখা মনে করিয়ে দিয়েছে, যোগ্যতার শর্ত অস্পষ্ট থাকলে আর প্রশাসনিক জটিলতা থেকে গেলে সুবিধা কাগজেই থেকে যেতে পারে। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিধি, কর্মীদের শেয়ার মালিকানা ও বিদেশি মুদ্রা সংক্রান্ত প্রশ্নগুলোও এখনো অমীমাংসিত।
আপনার জন্য কী করণীয়
আপনি যদি ফ্রিল্যান্সার বা কনটেন্ট ক্রিয়েটর হন, আয় ব্যাংকিং চ্যানেলে আনার হিসাব গুছিয়ে রাখুন, কারণ বক্তৃতায় কর ছাড়ের যুক্তি হিসেবে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে আয় আনার কথাই বলা হয়েছে। স্টার্টআপ চালালে নিবন্ধনের শর্ত প্রকাশ হওয়ার দিকে নজর রাখুন। আর নতুন কম্পিউটার কেনার পরিকল্পনা থাকলে বাজারের দাম দেখে সিদ্ধান্ত নিন, শুল্ক কমার প্রস্তাব মানেই দাম সঙ্গে সঙ্গে কমে যাওয়া নয়।
আমাদের মতে, এই বাজেটের ডিজিটাল অংশকে দুই ভাগে দেখা উচিত। কর ছাড়ের প্রস্তাবগুলো নির্দিষ্ট ও মূল্যায়নযোগ্য। তহবিল, এআই আর ১০ শতাংশ জিডিপির লক্ষ্য এখনো মূলত ঘোষণা। এখন দেখার বিষয়, পরের ধাপে অর্থবিল, প্রজ্ঞাপন ও নীতিমালায় এগুলো কতটা নির্দিষ্ট রূপ পায়।
সূত্র
- Bangladesh Customs, NBR: National Budget Speech FY2026-27 (English)
- Dhaka Tribune: Budget FY27 bets on AI with Tk500cr innovation fund
- The Business Standard: Budget FY27: Key measures and takeaways
- The Daily Star: Decoding Bangladesh's ambitious budget for startups
- The Daily Star: Bangladesh Tk 9 Lakh Crore Budget FY27
- Dhaka Tribune: The FY2026-27 digital agenda