গত দুই দশকে বাংলাদেশে সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত এবং জনপ্রিয় বিষয়গুলোর একটি হলো কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই)। দেশের প্রায় প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিষয়টি পড়ানো হচ্ছে এবং প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে এই বিভাগে ভর্তি হচ্ছে। অভিভাবকদের চোখেও সিএসই মানেই গুগল-ফেসবুকে চাকরি, আকাশছোঁয়া বেতন আর বিদেশে পাড়ি জমানোর সোনালি টিকেট। কিন্তু এই চকচকে ছবির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার এবং হতাশাজনক বাস্তবতা। বাস্তবতা হলো, প্রতি বছর পাশ করে বের হওয়া হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েটের একটি বিশাল অংশ চাকরির বাজারের জন্য ন্যূনতম দক্ষতাও অর্জন করতে পারছে না। দেশের সফটওয়্যার কোম্পানিগুলো প্রতিনিয়ত অভিযোগ করছে যে, তারা নিয়োগ দেওয়ার মতো যোগ্য প্রার্থী খুঁজে পাচ্ছে না।

তাহলে সমস্যাটা কোথায়? এত এত বিশ্ববিদ্যালয়, এত এত গ্র্যাজুয়েট, তবুও কেন এই দক্ষতার সংকট? কেন আমাদের তরুণেরা চার বছর ধরে অ্যালগরিদম, ডেটা স্ট্রাকচার, আর প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজ শেখার পরও একটি বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানের জন্য সফটওয়্যার বা প্রোডাক্ট তৈরি করতে পারে না? এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গভীরে প্রবেশ করতে হবে। আমরা এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছি যা শিক্ষার্থীদের মুখস্থ করতে শেখায়, কিন্তু চিন্তা করতে শেখায় না; যা তাদের বিদেশের সমস্যা সমাধানের জন্য প্রস্তুত করে, কিন্তু নিজের দেশের মাটির সমস্যা চিনতে শেখায় না। এটি একটি গোলকধাঁধা, যেখানে শিক্ষার্থীরা প্রবেশ করে উজ্জ্বল স্বপ্ন নিয়ে, আর বেরিয়ে আসে একটি অর্থহীন সার্টিফিকেট এবং একরাশ হতাশা নিয়ে। এই প্রবন্ধে আমরা বিশ্লেষণ করব, কেন আমাদের সিএসই ডিগ্রিগুলো প্রায়শই 'দক্ষতা তৈরির কারখানা' না হয়ে 'সার্টিফিকেট বিক্রির দোকানে' পরিণত হচ্ছে।

মূল সংকট: বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন এক শিক্ষা ব্যবস্থা

বাংলাদেশের সিএসই শিক্ষার মূল সংকট হলো এর সাথে বাস্তব জগতের, বিশেষ করে বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতার, কোনো সংযোগ নেই। আমাদের পাঠ্যক্রম এবং শিক্ষাদান পদ্ধতি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যা শিক্ষার্থীদেরকে একটি তাত্ত্বিক বুদবুদের মধ্যে আটকে রাখে।

  • মুখস্থবিদ্যা ও গ্রেড-কেন্দ্রিক সংস্কৃতি: আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে গ্রেড পাওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা। শিক্ষার্থীরা শেখে কীভাবে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া যায়, কিন্তু শেখে না কীভাবে জ্ঞানকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হয়। তারা কঠিন কঠিন অ্যালগরিদম মুখস্থ করে, প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতার জন্য তৈরি হয়, কিন্তু একটি বাস্তব গ্রাহকের জন্য সফটওয়্যার তৈরির জীবন চক্র (life cycle) সম্পর্কে কিছুই জানে না।
  • প্রজেক্ট এবং অ্যাসাইনমেন্টের নামে প্রহসন: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেমিস্টার ফাইনাল প্রজেক্ট বা অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়। কিন্তু এর একটি বড় অংশই হয় ইন্টারনেট থেকে হুবহু নকল করা, অথবা গিটহাব থেকে ক্লোন করে সামান্য পরিবর্তন করে জমা দেওয়া। শিক্ষকরাও প্রায়শই এই দায়সারা কাজকে গ্রহণ করেন এবং শিক্ষার্থীরাও ফিল্ডে গিয়ে বাস্তব ডেটা সংগ্রহ বা ব্যবহারকারীদের সাথে কথা বলার কষ্টটুকু করতে চায় না।
  • গ্লোবাল কনটেক্সট, লোকাল ব্লাইন্ডনেস: আমাদের পাঠ্যক্রম মূলত পশ্চিমা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অনুসরণ করে তৈরি। এতে কোনো ভুল নেই, কিন্তু সমস্যা হলো প্রয়োগের ক্ষেত্রে। আমাদের শিক্ষার্থীরা যে সমস্যাগুলো সমাধান করতে শেখে, সেগুলো প্রায়শই যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের প্রেক্ষাপটে তৈরি। ফলে, তারা নিজের দেশের মৌলিক এবং জটিল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে বা তার সমাধান করতে ব্যর্থ হয়।

ইন্টারনেট-নির্ভরতা এবং স্থানীয় প্রেক্ষাপটের প্রতি চরম উদাসীনতা

আজকের যুগে জ্ঞান অর্জনের জন্য ইন্টারনেটের উপর নির্ভর করাটা স্বাভাবিক। কিন্তু এটি যখন অলসতা এবং বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়ার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখনই বিপদ। আমাদের শিক্ষার্থীরা যেকোনো সমস্যা সমাধানের জন্য প্রথমেই ইন্টারনেটে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং প্রথম যে সমাধান বা ডেটাসেটটি পায়, সেটি দিয়েই কাজ শুরু করে দেয়, যা প্রায় সবসময়ই পশ্চিমা বিশ্বের প্রেক্ষাপটে তৈরি।

বাস্তব উদাহরণ: যেখানে তত্ত্ব এবং বাস্তবতা মুখোমুখি

এই বিচ্ছিন্নতা বোঝার জন্য কিছু বাস্তব উদাহরণ দেখা যাক, যা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অহরহ ঘটছে।

  • হসপিটাল ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার: একজন শিক্ষার্থীকে একটি বাংলাদেশি হাসপাতালের জন্য অটোমেশন সফটওয়্যার তৈরি করতে বলা হলো। তার প্রথম কাজ হওয়া উচিত ছিল ঢাকার কোনো একটি সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে কয়েকদিন সময় কাটানো—সেখানকার ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ড বয় এবং রোগীদের কাজের প্রক্রিয়া (workflow)কাজের প্রক্রিয়া (workflow)কোনো কাজ সম্পন্ন করার ধারাবাহিক ধাপগুলোর প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করা। কীভাবে রোগী ভর্তি হয়, কীভাবে বিলিং হয়, প্যাথলজি রিপোর্ট কীভাবে ম্যানেজ করা হয়, এখানকার 'দালাল' বা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কীভাবে সিস্টেমকে প্রভাবিত করে—এই বাস্তব অভিজ্ঞতা ছাড়া একটি কার্যকর সফটওয়্যার তৈরি অসম্ভব। কিন্তু আমাদের শিক্ষার্থী কী করে? সে ইন্টারনেট থেকে একটি ওপেন-সোর্সওপেন-সোর্সযার সোর্স কোড সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে এবং যে কেউ দেখতে, পরিবর্তন করতে পারে হসপিটাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ডাউনলোড করে, যা হয়তো কোনো আমেরিকান হাসপাতালের জন্য তৈরি, এবং সেটিকেই তার প্রজেক্ট হিসেবে জমা দেয়। ফলাফল? একটি সুন্দর দেখতে কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ অকেজো একটি সফটওয়্যার।
  • কৃষিফসলের রোগ নির্ণয়: কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। একজন শিক্ষার্থীকে বলা হলো একটি মোবাইল অ্যাপ তৈরি করতে যা পাতার ছবি দেখেই ফসলের রোগ নির্ণয় করতে পারবে। এর জন্য প্রয়োজন বাংলাদেশের স্থানীয় ফসল—যেমন পটল, করলা, বিভিন্ন জাতের আম বা ধান—এবং তাদের সাধারণ রোগগুলোর হাজার হাজার ছবির একটি স্থানীয় ডেটাসেটডেটাসেটমেশিন লার্নিং মডেল প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহৃত সুসংগঠিত তথ্য বা ছবির সংগ্রহ। এই ডেটা সংগ্রহের জন্য তাকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কৃষকদের কাছে যেতে হবে, ছবি তুলতে হবে এবং কৃষি বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নিতে হবে। কিন্তু শিক্ষার্থী সহজ পথটিই বেছে নেয়। সে ইন্টারনেট থেকে আমেরিকার ভুট্টা বা টমেটোর রোগের একটি বিশাল ডেটাসেট (যেমন PlantVillage) ডাউনলোড করে তার উপর একটি মডেল ট্রেইন করে। সেই মডেল হয়তো আমেরিকার ফসলের জন্য ৯০% সঠিক তথ্য দেয়, কিন্তু বাংলাদেশের 'বেগুনের ঢলে পড়া' রোগ চিনতে পারে না।
  • পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ট্র্যাকিং অ্যাপ: ঢাকায় চলাচলকারী একজন যাত্রীর জন্য একটি নির্ভরযোগ্য বাস ট্র্যাকিং অ্যাপ সোনার হরিণের মতো। একজন শিক্ষার্থী এই সমস্যা সমাধানের জন্য একটি অ্যাপ বানাতে চাইল। পশ্চিমা মডেল অনুসরণ করে, সে হয়তো বাসের জন্য স্ট্যান্ডার্ড GTFS (General Transit Feed Specification)GTFS (General Transit Feed Specification)বিভিন্ন শহরে গণপরিবহনের রুট ও সময়সূচি প্রকাশের একটি আন্তর্জাতিক মানক তথ্য বিন্যাস ডেটা খুঁজতে শুরু করবে, যা বাংলাদেশে অস্তিত্বহীন। একটি বাস্তব সমাধান তৈরির জন্য তাকে ঢাকার বিভিন্ন বাস কোম্পানির মালিকদের সাথে কথা বলতে হবে, চালক ও কন্ডাক্টরদের সাথে ঘুরতে হবে, ম্যানুয়ালি বাসের রুট ম্যাপ করতে হবে এবং হয়তো যাত্রীদের কমিউনিটি রিপোর্টিং-এর উপর ভিত্তি করে একটি সিস্টেম দাঁড় করাতে হবে। এই মাঠপর্যায়ের কাজ করার আগ্রহ বা মানসিকতা কোনোটাই তার নেই।
  • ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ফিনটেক অ্যাপ: বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় চালিকাশক্তি হলো পাড়ার মোড়ের 'টং দোকান' বা ছোট মুদি দোকান। একজন শিক্ষার্থী এদের জন্য একটি ফিনটেক অ্যাপ বানানোর প্রজেক্ট নিল। বিদেশি মডেল দেখে সে হয়তো ক্রেডিট কার্ড পেমেন্ট, ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট, বা জটিল অ্যাকাউন্টিং ফিচার যোগ করবে। কিন্তু সে এটা বোঝার চেষ্টা করবে না যে, এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর আসল সমস্যা হলো 'বাকির খাতা' পরিচালনা করা, মহাজনের কাছ থেকে অনানুষ্ঠানিক ঋণ নেওয়া, এবং তার বেশিরভাগ লেনদেন হয় নগদে বা মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (bKash/Nagad) এর মাধ্যমে। একটি কার্যকর অ্যাপ তৈরি করতে হলে তাকে দোকানে বসে তাদের প্রতিদিনকার লেনদেন ও সমস্যাগুলো বুঝতে হতো।
  • ই-কমার্স লজিস্টিকস সিস্টেম: একজন শিক্ষার্থী একটি ই-কমার্স ওয়েবসাইটের জন্য লজিস্টিকস মডিউল তৈরি করছে। সে হয়তো আমেরিকার মতো জিপ কোড এবং আদর্শ ঠিকানা বিন্যাসের উপর ভিত্তি করে একটি ডেলিভারি সিস্টেম ডিজাইন করবে। সে পুরোপুরি এড়িয়ে যাবে ঢাকার বাস্তবতাকে, যেখানে বাড়ির নম্বর বা রাস্তার নাম প্রায়ই অস্পষ্ট, যেখানে একটি ঠিকানা খুঁজে বের করতে ডেলিভারি এজেন্টের স্থানীয় জ্ঞানের উপর নির্ভর করতে হয়, এবং যেখানে 'অমুক ভাইয়ের বাসার পাশের গলি' একটি গুরুত্বপূর্ণ ল্যান্ডমার্ক।

দায় কার? বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর সম্মিলিত ব্যর্থতা

এই করুণ পরিস্থিতির জন্য এককভাবে কাউকে দায়ী করা কঠিন। এটি একটি সম্মিলিত ব্যর্থতার ফলাফল।

  • বিশ্ববিদ্যালয় ও কর্তৃপক্ষ: "ডিগ্রি বিক্রির দোকান" অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই এখন নিছক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করানো এবং একটি ডিগ্রি ধরিয়ে দেওয়া। ইন্ডাস্ট্রির সাথে সংযোগ স্থাপন, কারিকুলাম আধুনিকায়ন, ল্যাবের সরঞ্জাম কেনা বা গবেষণায় বিনিয়োগ করার দিকে তাদের কোনো মনোযোগ নেই। তারা সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য 'সিএসই' বিভাগ খোলে, কিন্তু সেই বিভাগের জন্য যোগ্য শিক্ষক বা অবকাঠামো নিশ্চিত করে না। দিনশেষে, এটি একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে, যেখানে 'ডিগ্রি' নামক একটি পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে।
  • শিক্ষক সমাজ: তত্ত্বের জগতে বসবাস আমাদের অনেক শিক্ষকেরই বাস্তব শিল্প জগতে কাজ করার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তারা যা বইতে পড়েছেন বা নিজেরা যখন ছাত্র ছিলেন যা শিখেছেন, তাই পড়িয়ে যাচ্ছেন। তাদের অনেকেই নতুন প্রযুক্তি বা ইন্ডাস্ট্রির চাহিদা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। তারা শিক্ষার্থীদেরকে মাঠপর্যায়ের প্রজেক্ট করতে উৎসাহিত করার পরিবর্তে, তাত্ত্বিক জ্ঞান এবং পরীক্ষার ফলাফলের উপরই বেশি জোর দেন।
  • শিক্ষার্থীদের মানসিকতা: শর্টকাট এবং অনাগ্রহ একই সাথে, শিক্ষার্থীদের মানসিকতাও একটি বড় সমস্যা। তাদের মধ্যে একটি বড় অংশের মাঝেই শেখার আগ্রহের চেয়ে ভালো গ্রেড পাওয়ার আগ্রহ বেশি। তারা চ্যালেঞ্জ নিতে ভয় পায় এবং মাঠপর্যায়ের কাজকে 'অপ্রয়োজনীয়' ঝামেলা বলে মনে করে। ইন্টারনেট থেকে কপি করে বা সিনিয়রদের প্রজেক্ট নিয়ে চালিয়ে দেওয়ার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তার দায় তারাও এড়াতে পারে না।

উত্তরণের পথ: কীভাবে এই গোলকধাঁধা থেকে বের হওয়া সম্ভব?

এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে একটি আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন, যা সকল পক্ষকে একযোগে করতে হবে।

  • কারিকুলামের আমূল সংস্কার: পাঠ্যক্রম থেকে অপ্রয়োজনীয় তাত্ত্বিক বিষয় কমিয়ে বাস্তব সমস্যা-ভিত্তিক প্রজেক্ট (Problem-Based Learning)বাস্তব সমস্যা-ভিত্তিক প্রজেক্ট (Problem-Based Learning)তাত্ত্বিক পাঠের বদলে বাস্তব সমস্যা সমাধানের মধ্য দিয়ে শেখার একটি পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রতিটি কোর্সের সাথে একটি বাস্তবসম্মত প্রজেক্ট বাধ্যতামূলক করতে হবে, যা নকল করা প্রায় অসম্ভব।
  • বাধ্যতামূলক ইন্ডাস্ট্রি ইন্টার্নশিপ: গ্র্যাজুয়েশনের শর্ত হিসেবে অন্তত ৩-৬ মাসের ইন্ডাস্ট্রি ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করতে হবে। এটি শিক্ষার্থীদেরকে কর্পোরেট জগৎ এবং বাস্তব কাজের সাথে পরিচিত করাবে।
  • শিক্ষক-শিল্প বিনিময়: শিক্ষকদের জন্য ইন্ডাস্ট্রিতে স্বল্পমেয়াদী কাজ বা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা আধুনিক প্রযুক্তি এবং কাজের ধারা সম্পর্কে জানতে পারেন। একইভাবে, ইন্ডাস্ট্রির অভিজ্ঞ পেশাদারদের বিশ্ববিদ্যালয়ে গেস্ট লেকচারার বা খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে আমন্ত্রণ জানাতে হবে।
  • স্থানীয় ডেটাসেট এবং গবেষণা প্রকল্পে বিনিয়োগ: বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারের উচিত বাংলাদেশের স্থানীয় সমস্যা সংক্রান্ত ডেটাসেট তৈরির জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা এবং গবেষণায় বিনিয়োগ করা। কৃষিক্ষেত্র, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মতো খাতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (PPP)সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (PPP)সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে অর্থায়ন ও পরিচালনা করে এমন প্রকল্প কাঠামো ডেটা সংগ্রহ করা যেতে পারে।
  • মূল্যায়ণ পদ্ধতির পরিবর্তন: শুধু লিখিত পরীক্ষার উপর নির্ভর না করে, প্রজেক্টের গুণগত মান, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং বাস্তব প্রয়োগের উপর ভিত্তি করে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করতে হবে।

বাংলাদেশের কম্পিউটার সায়েন্স শিক্ষা এক কঠিন crossroads-এ দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে যেমন সম্ভাবনার বিশাল আকাশ, অন্যদিকে তেমনই বাস্তবতাহীন শিক্ষার অতল গহ্বর। আমরা যদি এখনই এই ব্যবস্থার সংস্কার না করি, তাহলে আমরা শুধু হাজার হাজার হতাশ এবং অদক্ষ গ্র্যাজুয়েটই তৈরি করব না, বরং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে দেশ হিসেবেও পিছিয়ে পড়ব। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে 'সার্টিফিকেট বিক্রির দোকান' এর মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে সত্যিকারের 'জ্ঞান ও দক্ষতা তৈরির কেন্দ্রে' পরিণত হতে হবে। শিক্ষকদেরকে তাত্ত্বিক খোলস থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবতার মেন্টর হতে হবে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, শিক্ষার্থীদেরকে শর্টকাটের পথ পরিহার করে প্রকৃত সমস্যা সমাধানে আগ্রহী হতে হবে। তবেই আমাদের সিএসই ডিগ্রিগুলো অর্থবহ হবে এবং আমাদের তরুণেরা দেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে সত্যিকারের ভূমিকা রাখতে পারবে।