ধরুন আপনি ঢাকার বাইরে কোনো গ্রামে আপনার মা-বাবার কাছে টাকা পাঠাবেন। চৌদ্দ বছর আগে হলে এই কাজটার জন্য আপনাকে হয় ব্যাংকে লাইন দিতে হতো, নয়তো বিশ্বাসযোগ্য কারও হাতে খাম পাঠাতে হতো। আজ আপনি মোবাইলের কয়েকটা বাটন চাপলেই কাজ শেষ। দক্ষিণ এশিয়ায় মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (MFS)মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (MFS)মোবাইল ফোনের মাধ্যমে টাকা পাঠানো, জমা রাখা ও লেনদেনের ডিজিটাল আর্থিক সেবা ব্যবস্থা-এর সবচেয়ে সফল উদাহরণগুলোর একটি বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সাল শেষে এই খাতে নিবন্ধিত অ্যাকাউন্টের সংখ্যা প্রায় ২২ কোটি, সক্রিয় ব্যবহারকারী প্রায় ৯ কোটি, আর দৈনিক লেনদেনের গড় পরিমাণ ৩,৫০০ কোটি টাকারও বেশি। এই বিশাল ডিজিটাল অর্থনৈতিক কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে তিনটি স্তম্ভের ওপর — বিকাশ, রকেট ও নগদ।
বিকাশ কীভাবে "বিকাশ" শব্দটাকেই ক্রিয়াপদ বানিয়ে ফেলল
২০১১ সালের জুলাইয়ে BRAC Bank ও Money in Motion (যুক্তরাষ্ট্র)-এর যৌথ উদ্যোগে যাত্রা শুরু করে বিকাশ (bKash)। ২০১৪ সালে আইএফসি এবং ২০১৮ সাল থেকে চীনের Ant Financial (Alipay) বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ শেয়ারহোল্ডার হয়। ধারাবাহিক মার্কেটিং, কাঠামোগত এজেন্ট নেটওয়ার্ক ও গণপরিচিত ব্র্যান্ডিংয়ের জোরে বিকাশ আজ MFS বাজারের সবচেয়ে বড় খেলোয়াড়। "বিকাশ" শব্দটা এখন কার্যত মোবাইল মানি ট্রান্সফারের সমার্থক — আমরা বলি "বিকাশ করে দিচ্ছি", ব্র্যান্ডের নামটাই একটা সাধারণ ক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।
রকেট কেন পিছিয়ে পড়েও প্রাসঙ্গিক থেকে গেছে
একই ২০১১ সালেই Dutch-Bangla Bank চালু করেছিল DBBL Mobile Banking, যা ২০১৬ সালে রিব্র্যান্ড হয়ে "Rocket" নাম নেয়। ব্যাংক-কেন্দ্রিক কাঠামোর কারণে রকেট চিরকালই বেতন-বিতরণ, ইউটিলিটি বিল ও আনুষ্ঠানিক লেনদেনে শক্তিশালী থেকেছে। ব্যবহারকারী অভিজ্ঞতার দিক থেকে বিকাশের থেকে পিছিয়ে পড়েছে, এটা সত্যি — কিন্তু DBBL-এর বিশাল ATM ও শাখা নেটওয়ার্ক তাকে এমন একটা অবস্থান দিয়েছে যা সহজে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।
নগদের উত্থান দ্রুততম, কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রশ্নবিদ্ধ কেন
২০১৮ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস হিসেবে চালু হয় নগদ (Nagad), পরিচালনায় ছিল Third Wave Technologies। আগ্রাসী প্রাইসিং (প্রাথমিকভাবে শূন্য ক্যাশ-আউট ফি-সহ বিকল্প), সরকারি ভাতা ও উপবৃত্তি বিতরণ, এবং শক্তিশালী বিজ্ঞাপন — এই তিনের সমন্বয়ে নগদ অল্প সময়েই বাজারে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছিল, তবে ২০২৪ সালে নগদের লাইসেন্স নবায়ন ও নিয়ন্ত্রক নজরদারি নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটা তার পরবর্তী অধ্যায়কে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
বাজারের বাকি খেলোয়াড়রা — ছোট হলেও অবহেলার নয়
- Upay — ইউসিবির উদ্যোগ, শহুরে ডিজিটাল লেনদেনে জোর।
- TAP — TAP Pay Services-এর নতুন আসা খেলোয়াড়।
- SureCash — ছাত্র-শিক্ষক ও পাবলিক সার্ভিসে নির্দিষ্ট উপস্থিতি।
- Islami Wallet — শরিয়াহ-ভিত্তিক ওয়ালেট, ইসলামী ব্যাংক গ্রাহকদের জন্য।
তিন বড় খেলোয়াড়ের বাইরে এই নামগুলো শিরোনামে আসে না, কিন্তু নির্দিষ্ট গ্রাহকগোষ্ঠীর কাছে তারা প্রাসঙ্গিক।
অবকাঠামো এগোচ্ছে, কিন্তু আসল সমস্যাগুলো এখনো রয়ে গেছে
২০২৩ সালে চালু হয়েছে MFS ইন্টারঅপারেবিলিটিMFS ইন্টারঅপারেবিলিটিভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সেবা পরস্পরের সাথে সরাসরি সংযুক্তভাবে কাজ করার সক্ষমতা — একটি MFS থেকে অন্যটিতে সরাসরি টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা, যদিও বাস্তবে এর ব্যবহার এখনো সীমিত। ২০২২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক চালু করেছে Bangla QRBangla QRবাংলাদেশ ব্যাংকের একীভূত কিউআর কোড স্ট্যান্ডার্ড, যা দিয়ে যেকোনো ব্যাংক বা MFS অ্যাপ থেকে একই কোড স্ক্যান করে পেমেন্ট করা যায় — একটি অভিন্ন কিউআর স্ট্যান্ডার্ড, যেখানে সব ব্যাংক ও MFS-এর গ্রাহক একটিমাত্র কিউআর স্ক্যান করে দোকানে পেমেন্ট করতে পারেন।
চ্যালেঞ্জও কম নেই। গ্রামীণ ডিজিটাল সাক্ষরতা এখনো কম, এজেন্ট-পর্যায়ে প্রতারণা ও পিন হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা নিয়মিত ঘটে, আর ক্যাশ-আউট ফি (১.৮৫% হারে) এখনো অনেক নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ভারী বোঝা। পাশাপাশি নিয়মিত ফিশিং কল ও ভুয়া "বিকাশ অফিস"-এর নামে সামাজিক প্রকৌশলেরসামাজিক প্রকৌশলেরমানুষকে প্রতারিত করে গোপন তথ্য বা টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কৌশল, প্রযুক্তিগত হ্যাকিং নয় হামলা চলছেই। এই মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান না হলে শুধু অ্যাকাউন্ট-সংখ্যা বাড়ানোকে সাফল্য বলা যায় না।
ডিজিটাল টাকা কি এই পুরো চিত্রটাই বদলে দেবে?
২০২৩ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার ঘোষণা দেন — একটি Central Bank Digital Currency (CBDC)Central Bank Digital Currency (CBDC)কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক জারি করা ও নিয়ন্ত্রিত সরকারি ডিজিটাল মুদ্রা বা "ডিজিটাল টাকা" চালুর সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়েছে। এটা বাস্তবায়িত হলে CBDC ব্যাংকিং কাঠামোর মাধ্যমে সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহারকারীর হাতে পৌঁছে দেবে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো MFS ইকোসিস্টেমকেই নতুন করে সাজাতে পারে।
স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১ রূপকল্পের অন্যতম স্তম্ভ হলো ক্যাশলেস সোসাইটি। সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে MFS, ব্যাংক, পেমেন্ট সুইচ (NPSB)পেমেন্ট সুইচ (NPSB)ব্যাংকগুলোর মধ্যে আন্তঃলেনদেন সংযোগকারী জাতীয় পেমেন্ট সুইচিং ব্যবস্থা ও CBDC-কে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কর্মসংস্থান, রেমিট্যান্স চ্যানেল, এসএমই অর্থায়ন — প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই অবকাঠামোর প্রভাব ক্রমশ স্পষ্ট হবে।
চৌদ্দ বছর আগে যে ব্যবস্থা ছিল বিরল, আজ সেটি বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে পৌঁছে গেছে — এটা কম কথা নয়। তবে আমার কাছে আসল প্রশ্নটা এখন আর "কতজন ব্যবহার করেন" নয় — প্রশ্ন হলো, কীভাবে এই লেনদেন-ভিত্তিক ব্যবস্থা একটি সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক বাস্তুতন্ত্রে রূপ নেবে, যেখানে সঞ্চয়, ঋণ, বিমা সবই ডিজিটাল মাধ্যমে দরিদ্রতম পরিবারের কাছেও পৌঁছাবে।