৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে এক দিনে ৩১টি বিল পাস হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের অধ্যাদেশগুলোকে আইনে রূপ দেওয়ার সেই তালিকায় ছিল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা বিল, ২০২৬। খবরটি আলাদা করে হয়তো আপনার চোখে পড়েনি, কিন্তু এআই নিয়ে যাঁরা ভাবছেন তাঁদের জন্য এর গুরুত্ব আছে। কারণ জানুয়ারিতে মতামতের জন্য প্রকাশিত জাতীয় এআই নীতি ২০২৬-২০৩০-এর খসড়া তথ্য সুরক্ষার এই কাঠামোর ওপর ভর করেই দাঁড়িয়ে আছে।
তাই এখনই খসড়াটি একবার ভালো করে পড়ে নেওয়ার সময়। তবে একটি কথা শুরুতেই পরিষ্কার থাকা দরকার: এটি খসড়া, চূড়ান্ত নীতি নয়। এই লেখা প্রকাশের সময় পর্যন্ত চূড়ান্ত অনুমোদনের কোনো খবর আমরা পাইনি। নিচের বিবরণ মূলত জানুয়ারির খসড়া নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে লেখা, তাই পরের সংস্করণে কোনো সংখ্যা বা ধারা বদলে যাওয়া অসম্ভব নয়।
খসড়াটি কোথা থেকে এল
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ১৪ জানুয়ারি তাদের ওয়েবসাইটে খসড়ার ১.১ সংস্করণ তুলে দিয়ে নাগরিকদের মতামত চায়। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি ২০২৪ সালের একটি খসড়ার জায়গা নিচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি। তখনকার প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব ওই প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করেন, আগের খসড়ার মনোযোগ ছিল অবকাঠামোয়, আর নতুনটির লক্ষ্য সেবা দেওয়ার সমস্যাগুলো।
খসড়া অনুযায়ী এই নীতি চলবে ২০৩০ সাল পর্যন্ত। তারপর এর জায়গা নেবে একটি স্থায়ী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আইন। অর্থাৎ নীতিটি নিজেকে সাময়িক সেতু হিসেবেই দেখছে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দেশে নতুন সরকার এসেছে, ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তৈরি এই খসড়ার কতটা অপরিবর্তিত থাকবে, সেটিও এখন একটি খোলা প্রশ্ন।
ঝুঁকির স্তর: কোন এআই চলবে, কোনটি চলবে না
খসড়ার কেন্দ্রে আছে ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ। মানে, সব এআইকে এক পাল্লায় মাপা হবে না। কাজটি মানুষের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলে, সেই অনুযায়ী নিয়ম কড়া বা শিথিল হবে। ডেইলি স্টার চারটি স্তরের কথা জানিয়েছে: নিষিদ্ধ, উচ্চঝুঁকি, সীমিত ঝুঁকি ও নিম্নঝুঁকি।
- নিষিদ্ধ: নাগরিকদের সামাজিক স্কোরিং, নির্বিচার বায়োমেট্রিক নজরদারি এবং নির্বাচন বা গণতন্ত্র ব্যাহত করে এমন ডিপফেক।
- উচ্চঝুঁকি: স্বাস্থ্যসেবা, আইন প্রয়োগ ও ঋণ মূল্যায়নের মতো ক্ষেত্র। ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস কর্মসংস্থান ও সরকারি সেবাকেও এই তালিকায় উল্লেখ করেছে। এসব ব্যবস্থায় অ্যালগরিদমিক প্রভাব মূল্যায়ন ও কঠোর মানবিক তদারকি লাগবে।
- দায়: উচ্চঝুঁকি এআই যিনি ব্যবহারে আনবেন, ক্ষতি হলে উদ্দেশ্য যা-ই থাকুক, তাঁকে কঠোর দায় নিতে হবে।
- তদারকি: সংসদের আইনে গঠিত একটি স্বাধীন তদারকি কমিটি পক্ষপাত যাচাই করবে এবং নৈতিক মান বা মানবাধিকার লঙ্ঘন করলে কোনো অ্যাপ্লিকেশন স্থগিতের সুপারিশ করতে পারবে।
ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস খসড়াটির সুরকে নিরাপত্তাকেন্দ্রিক বলে বর্ণনা করেছে। ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় তথ্য সম্পদ রক্ষায় জোর আছে, সংবেদনশীল তথ্যে রাষ্ট্রের তদারকি অগ্রাধিকার পেয়েছে। এই জোরটি সুরক্ষা দিতে পারে, আবার তথ্য পাওয়া কঠিনও করতে পারে। গবেষক ও নির্মাতাদের জন্য তাই আসল প্রশ্ন হবে, বাস্তবে তথ্যে প্রবেশাধিকার কতটা সহজ থাকে।
ডিপফেক, অনলাইন গুজব ও ভুয়া তথ্য মোকাবিলার ব্যবস্থাও খসড়ায় আছে, আর ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী তা সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োগ হওয়ার কথা। আন্তর্জাতিক দিক থেকে খসড়াটি ওইসিডির এআই নীতি, ইউনেসকোর এআই নৈতিকতা সুপারিশ এবং আসিয়ানের নির্দেশনার মতো কাঠামোর উল্লেখ করেছে। পলিসি ম্যাগাজিনের বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা পাওয়া, সেই সিদ্ধান্তে আপত্তি তোলা এবং মানুষের পর্যালোচনা চাওয়ার অধিকারের কথাও খসড়ায় আছে। এই অধিকারগুলো বাস্তবে চালু হলে ঋণ বা সরকারি সেবা থেকে বাদ পড়া একজন নাগরিকের জন্য তা অর্থবহ হতে পারে।
আপনি যদি এআই শিখতে চান
শেখার দিকে খসড়ার সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো প্রস্তাব হলো অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে এআই শিক্ষা চালু করা। ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন বলছে, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি পাঠ্যক্রমেও এআই শিক্ষা যুক্ত করার কথা আছে। পাশাপাশি আছে দক্ষতা বাড়ানোর কর্মসূচি। কেন এত তাড়া, তার উত্তর খসড়ার সংখ্যাগুলোতেই পাওয়া যায়।
ডেইলি স্টার জানিয়েছে, খসড়ার হিসাবে এআই উৎপাদনশীলতা ৪.৩ শতাংশ বাড়াতে পারে। উল্টো দিকে ২০৪১ সালের মধ্যে অটোমেশন পোশাক খাতের ৬০.৮ শতাংশ পর্যন্ত কাজকে, অর্থাৎ প্রায় ২৭ লাখ শ্রমিককে, ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। বিভিন্ন খাত মিলিয়ে ঝুঁকিতে থাকতে পারে ৫৩ লাখ ৮০ হাজার স্বল্পদক্ষ পদ। এগুলো পূর্বাভাস, নিশ্চিত ঘটনা নয়। তবু দিকটি স্পষ্ট: বাংলাদেশে এআই শুধু কম্পিউটার বিজ্ঞানের বিষয় থাকছে না, এটি কর্মসংস্থানের বিষয়ও।
বাংলা ভাষার জন্যও একটি বড় প্রস্তাব আছে। খসড়ায় বাংলাভিত্তিক একটি লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের কথা বলা হয়েছে, যা ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ডিজিটাল রূপে সংরক্ষণ করবে। সরকারি কম্পিউটিং শক্তির ক্ষেত্রেও একটি বাস্তব সূচনা হয়েছে। জানুয়ারিতে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ ২০টির বেশি জিপিইউ নিয়ে একটি শেয়ারড ক্লাউড সুবিধা চালু করে, যার রক্ষণাবেক্ষণ করবে জাতীয় ডেটা সেন্টারের দল। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়কে আগ্রহ জানাতে বলা হয়েছিল। ক্ষমতা ছোট, তবে শেখা ও ছোট পরীক্ষার জন্য একটি পথ।
অগ্রাধিকার খাত হিসেবে কৃষি ও স্বাস্থ্যের কথা আলাদা করে এসেছে। ডেইলি স্টারের তথ্য অনুযায়ী, কৃষিতে ১ কোটি ৬০ লাখ কৃষক পরিবারের জন্য নির্ভুল সেচ, পোকা শনাক্তকরণ ও স্থানীয় আবহাওয়া পূর্বাভাসের কথা ভাবা হয়েছে। স্বাস্থ্যে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও সংকট পূর্বাভাসে এআই ব্যবহারের প্রস্তাব আছে, তবে জীবন বদলে দেওয়ার মতো চিকিৎসা সিদ্ধান্ত থাকবে সনদপ্রাপ্ত চিকিৎসকের হাতেই। আপনি যদি প্রোগ্রামিং শিখছেন, এই দুটি খাত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কাজের ভালো জায়গা হতে পারে, কারণ এখানে স্থানীয় তথ্য ও বাংলা ভাষা বোঝার মূল্য আছে।
স্টার্টআপের লাভ কোথায়, চিন্তা কোথায়
উদ্যোক্তাদের জন্য খসড়ায় কয়েকটি স্পষ্ট প্রস্তাব আছে।
- এআই ইনোভেশন ফান্ড: গবেষণা, উন্নয়ন ও বাণিজ্যিকীকরণের জন্য ২০৩০ সাল পর্যন্ত ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকার প্রক্ষেপণ। সরল ভাগ করলে পাঁচ বছরে বছরে গড়ে ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা, যা একটি পুরো দেশের এআই খাতের জন্য খুব বড় অঙ্ক নয়।
- কর ও শুল্ক ছাড়: সার্ভার ও অ্যাক্সিলারেটর আমদানিতে স্টার্টআপ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রণোদনা।
- রেগুলেটরি স্যান্ডবক্স: তদারকির মধ্যে একটি নির্দিষ্ট পরিসরে নতুন এআই পণ্য পরীক্ষা করার সুযোগ।
- কেন্দ্রীয় কম্পিউট: একটি জাতীয় এআই কম্পিউট কৌশলের আওতায় জিপিইউ কিনে জাতীয় ডেটা সেন্টারে রাখার পরিকল্পনা।
চিন্তার দিকটিও আছে। নিউইয়র্কের স্টোনি ব্রুক ইউনিভার্সিটির শিক্ষক মো. আশরাফুল গনি ডেইলি স্টারকে বলেন, নীতি যে অধিকার ও নৈতিক শাসনকে দ্রুত বাণিজ্যিকীকরণের আগে রেখেছে সেটি ইতিবাচক। তবে তাঁর সতর্কতা হলো, যথেষ্ট কারিগরি সক্ষমতা ছাড়া শক্ত নিয়ন্ত্রণ অনিচ্ছাকৃতভাবে উদ্ভাবনের গতি কমাতে পারে, আর বাধ্যতামূলক মূল্যায়ন প্রাথমিক পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের ওপর বাড়তি বোঝা হতে পারে।
আমাদের মতে, স্বাস্থ্য বা ঋণ যাচাইয়ের মতো খাতে যাঁরা পণ্য বানাচ্ছেন, তাঁদের এখনই নথিপত্র গোছানোর অভ্যাস করা উচিত। মডেল কোন তথ্যে শেখানো হলো, কীভাবে পরীক্ষা হলো, ভুল হলে মানুষ কোথায় হস্তক্ষেপ করবে, এসব লিখে রাখা ভালো। তথ্য সুরক্ষা আইন পাসের পর এই শৃঙ্খলা আরও জরুরি হয়ে উঠতে পারে।
কাগজ থেকে বাস্তবে যাওয়ার প্রশ্ন
নীতি লেখা এক কাজ, চালু করা আরেক কাজ। পলিসি ম্যাগাজিনে কলামিস্ট অনিল ওয়াসিফ জানুয়ারিতে এই দুর্বলতার দিকেই আঙুল তোলেন। তাঁর বিশ্লেষণে, তখন প্রস্তাবিত সমন্বয়কারী সংস্থাটির অস্তিত্ব ছিল না, তদারকি কমিটির জন্য দরকারি আইনের খসড়াও হয়নি। তিনি মনে করিয়ে দেন, ২০১৯-২০ সালের জাতীয় এআই কৌশলের বিস্তারিত রোডম্যাপের প্রায় কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। ইউনেসকোর প্রস্তুতি মূল্যায়নে উঠে আসা খণ্ডিত ডেটা ও জিপিইউ সংকটের মতো সমস্যার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। এগুলো একজন বিশ্লেষকের মত, তবে প্রশ্নগুলো ন্যায্য।
পরের কয়েক মাসে তিনটি বিষয়ে নজর রাখতে পারেন। নতুন সরকার খসড়াটি কোন রূপে এগিয়ে নেয়, তহবিলের জন্য বাস্তবে বরাদ্দ আসে কি না, আর স্কুল পাঠ্যক্রমে এআই ঢোকার জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা হয় কি না। ততদিন নীতির অপেক্ষায় বসে থাকার দরকার নেই। এআইয়ের মৌলিক ধারণা, তথ্যের দায়িত্বশীল ব্যবহার আর ঝুঁকি বোঝার ক্ষমতা, এই তিনটি দক্ষতা যেকোনো নীতিতেই কাজে লাগবে।
সূত্র
- The Daily Star: Draft AI policy targets innovation, better public services
- The Financial Express: Draft AI policy tightens state oversight
- ICT Division: National AI Policy Bangladesh 2026-2030 (Draft V1.1) notice
- Dhaka Tribune: Parliament passes 31 bills related to IG-era ordinances
- The Daily Star: Govt launches first shared GPU cloud facility
- Policy Magazine: Bangladesh's AI Moment: Testing the Implementation Gap