এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের চার বড় প্রযুক্তি কোম্পানি তাদের প্রান্তিক ফল প্রকাশ করে। আয়ের খবরের চেয়েও বেশি আলোচনা হয় অন্য একটি সংখ্যা নিয়ে: এ বছর তারা অবকাঠামোয় কত ডলার ঢালবে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে অঙ্কটি ঘুরছে প্রায় ৭২৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। সংখ্যাটি এত বড় যে সহজে অনুভব করা কঠিন।

এই লেখায় তিনটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাক। সংখ্যাটি আসলে কোথা থেকে এল, টাকা যাচ্ছে কোথায়, আর এর দাম শেষ পর্যন্ত কে দিচ্ছে। শেষে দেখব, বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এর মানে কী।

৭২৫ বিলিয়ন ডলার সংখ্যাটি কীভাবে এল

চার কোম্পানির ঘোষিত হিসাব পাশাপাশি রাখলে ছবিটি পরিষ্কার হয়। এখানে পুঁজি ব্যয় বা ক্যাপেক্স মানে ডেটা সেন্টার, সার্ভার, জমি ও যন্ত্রপাতির মতো দীর্ঘমেয়াদি সম্পদে খরচ।

  • অ্যামাজন: ২০২৬ সালের জন্য প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার।
  • মাইক্রোসফট: এ বছর প্রায় ১৯০ বিলিয়ন।
  • অ্যালফাবেট: ১৮০ থেকে ১৯০ বিলিয়ন, আগের পূর্বাভাস ছিল ১৭৫ থেকে ১৮৫ বিলিয়ন।
  • মেটা: ১২৫ থেকে ১৪৫ বিলিয়ন, আগে ছিল ১১৫ থেকে ১৩৫ বিলিয়ন।

প্রতিটি কোম্পানির সর্বোচ্চ অঙ্ক যোগ করলে দাঁড়ায় ঠিক ৭২৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এটি একটি ঊর্ধ্বসীমার যোগফল, কোনো একক প্রতিষ্ঠানের ঘোষণা নয়। ব্যাংক অব আমেরিকার হিসাব থেকে নেওয়া সিএনবিসির তালিকায় চার কোম্পানির অঙ্ক যোগ করলে আসে ৭১০ বিলিয়নের মতো। ফরচুন লিখেছে, ৭০০ বিলিয়ন ছাড়াতে পারে। তাই ৭২৫ সংখ্যাটি বোঝার জন্য ভালো, কিন্তু একে নিশ্চিত খরচ ভাবা ঠিক হবে না।

আরও দুটি সতর্কতা আছে। এগুলো পরিকল্পনা, শেষ হওয়া খরচ নয়। আর ক্যাপেক্স কোম্পানির মোট অবকাঠামো খরচের হিসাব, তাই পুরো টাকাকে শুধু এআইয়ের খরচ বলা যায় না। তবু গতিটি অসাধারণ: ফরচুনের হিসাবে ২০২৪ সালে এই চার কোম্পানির ক্যাপেক্স ছিল ২০০ বিলিয়ন ডলারের একটু বেশি, ২০২৫ সালে প্রায় ৪১০ বিলিয়ন। ইভারকোর ও ব্যাংক অব আমেরিকার বিশ্লেষকেরা ২০২৭ সালে এই খাতের খরচ এক ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়ানোর পূর্বাভাস দিচ্ছেন।

পূর্বাভাসের সংখ্যা যে কত দ্রুত বদলায়, তার একটি উদাহরণও আছে। ফেব্রুয়ারিতে সিএনবিসি জানায়, ইউবিএসের হিসাবে বড় ক্লাউড কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত ক্যাপেক্স এ বছর ৭৭০ বিলিয়ন ডলারও ছাড়াতে পারে। ওই হিসাবে কোন কোন কোম্পানি ধরা হয়েছে, তার ওপর অঙ্ক বদলায়। তাই দুটি প্রতিবেদনের সংখ্যা মেলাতে গেলে আগে দেখে নিন, কয়টি কোম্পানি ধরা হয়েছে, আর হিসাবটি কবেকার।

টাকা যাচ্ছে কোথায়

ফরচুনের ব্যাখ্যায় খরচের বড় অংশ তিন জায়গায়: বিশেষ চিপ, ডেটা সেন্টার এবং নেটওয়ার্কিং। একটি বিশেষায়িত জিপিইউর দাম ৪০ হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে, আর এগুলো কেনা হয় পুরো সার্ভার ও ক্লাস্টার হিসেবে, যার দাম বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। বড় ডেটা সেন্টার একটি ছোট শহরের সমান বিদ্যুৎ টানতে পারে। ফরচুন জানিয়েছে, মাইক্রোসফটের খরচের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ যাচ্ছে জিপিইউ ও সিপিইউতে।

এই মৌসুমের নতুন খবর হলো মেমরি চিপ। মাইক্রোসফট জানিয়েছে, উপাদানের দাম বাড়ায় তাদের এ বছরের হিসাবের প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার এই খাতে যাচ্ছে। মার্ক জাকারবার্গও মেটার পূর্বাভাস বাড়ার মূল কারণ হিসেবে উপাদানের, বিশেষ করে মেমরির, দামের কথা বলেছেন। অর্থাৎ অঙ্ক বাড়ার একটি অংশ বেশি যন্ত্রের জন্য নয়, একই যন্ত্র বেশি দামে কেনার জন্য।

কোম্পানিগুলোর যুক্তি হলো, চাহিদা সত্যিই আছে। গুগল ক্লাউডের ব্যাকলগ, অর্থাৎ হাতে থাকা ভবিষ্যৎ চুক্তির অঙ্ক, দাঁড়িয়েছে ৪৬২ বিলিয়ন ডলারে, আর ক্লাউড আয় বেড়েছে ৬৩ শতাংশ। অ্যামাজনের এডব্লিউএস আয় বেড়েছে ২৮ শতাংশ।

অ্যালফাবেটের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা অ্যানাট আশকেনাজি এই চাহিদাকে অভূতপূর্ব বলেছেন। ফরচুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুগল ক্লাউডের আয় এক প্রান্তিকে ২০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে মনে রাখা দরকার, চাহিদার এই বর্ণনা আসছে যারা খরচ করছে তাদের কাছ থেকেই।

দাম দিচ্ছে কে

এত টাকার দাম একজন দিচ্ছেন না। অন্তত তিনটি পক্ষের কথা বলা যায়।

প্রথমত, বিনিয়োগকারী। কোম্পানির আয়ের যে অংশ এই খাতে যাচ্ছে, তার ফল দেখার অপেক্ষা করতে হচ্ছে শেয়ারধারীদের, আর তাঁরা সব কোম্পানিকে সমান চোখে দেখছেন না। ফলাফলের পর আফটার-আওয়ার্স লেনদেনে মেটার শেয়ার ৬ শতাংশের বেশি পড়ে, মাইক্রোসফটের প্রায় অপরিবর্তিত থাকে, আর অ্যালফাবেটের বাড়ে প্রায় ৭ শতাংশ। ফরচুনের ব্যাখ্যায়, অ্যালফাবেটের বেলায় বড় ভূমিকা ছিল গুগল ক্লাউডের প্রবৃদ্ধির। অর্থাৎ বাজার দেখতে চাইছে, খরচের বিপরীতে আয় আসছে কি না।

দ্বিতীয়ত, ঋণদাতা। আগে ধরে নেওয়া হতো এই খরচ কোম্পানির নিজের নগদ আয় থেকেই আসবে। এখন বন্ড বাজারের ভূমিকা বাড়ছে। ফেব্রুয়ারিতে অ্যালফাবেট প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ নেয়, যার মধ্যে ছিল ১০০ বছর মেয়াদি একটি বিরল স্টার্লিং বন্ড। ইউবিএস এ বছর বড় ক্লাউড কোম্পানিগুলোর পাবলিক বাজারে ঋণ ২৩০ থেকে ২৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দিয়েছে। ভ্যানগার্ডের একজন অর্থনীতিবিদ সিএনবিসিকে বলেছেন, এদের ব্যালান্স শিট এখনো শক্ত, তবে ঋণের চাপ বাড়ছে।

এর ঝুঁকিও আছে। সিএনবিসির প্রতিবেদনে বিনিয়োগকারীদের যে উদ্বেগের কথা এসেছে, তা হলো দ্রুত উন্নত হতে থাকা চিপ আজকের অবকাঠামোকে পুরনো করে দিতে পারে, আর বন্ডের অতিরিক্ত সরবরাহ বাজারে চাপ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ এখনকার ঋণের হিসাব মিলবে কি না, তা নির্ভর করছে ভবিষ্যতের আয়ের ওপর।

তৃতীয়ত, সাধারণ ক্রেতা, আর এই পক্ষটিই আমাদের সবচেয়ে কাছের। স্যামসাং, মাইক্রন ও এসকে হাইনিক্সের মতো মেমরি নির্মাতারা উৎপাদন সরিয়ে নিচ্ছে এআই ডেটা সেন্টারের উচ্চগতির মেমরির দিকে, ফলে ফোন ও কম্পিউটারের সাধারণ মেমরির জোগান কমছে। জানুয়ারিতে ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের পূর্বাভাস ছিল, ২০২৬ সালে স্মার্টফোনের গড় দাম প্রায় ৬.৯ শতাংশ বাড়তে পারে। কম দামের ফোনে আঘাত সবচেয়ে বেশি পড়ার কথা, কারণ সেখানে মুনাফা কম আর বাড়তি দাম সামলানোর জায়গাও কম। প্রতিবেদন বলছে, নির্মাতারা হয় বাড়তি খরচ ক্রেতার ওপর চাপাবেন, নয়তো ফোনের কনফিগারেশন কমাবেন। দুই ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত টাকার তুলনায় কম পাচ্ছেন ক্রেতা।

উন্নয়নশীল দেশের জন্য এর মানে কী

এই ব্যয়ের মানচিত্র খুব অসম। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বিশ্বের ডেটা সেন্টার সক্ষমতার ৭৭ শতাংশ ছিল উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে, মধ্যম আয়ের দেশে ২৩ শতাংশ, আর নিম্ন আয়ের দেশে ০.১ শতাংশেরও কম। মাথাপিছু হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রে সার্ভারের সংখ্যা নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ২০ হাজার গুণ।

ব্যবহারের ব্যবধানও চোখে পড়ার মতো। ২০২৫ সালের মে মাসের হিসাবে উচ্চ আয়ের দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীপ্রতি চ্যাটজিপিটি ভিজিট ছিল নিম্ন আয়ের দেশের প্রায় ৫০ গুণ, আর নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের প্রায় ৮ গুণ। বিশ্বব্যাংক কারণ হিসেবে চিপের ঘাটতি, প্রবেশের উচ্চ খরচ, সীমিত বিদ্যুৎ ও দুর্বল ডিজিটাল অবকাঠামোর কথা বলেছে।

তবে বিশ্বব্যাংক একটি আশার কথাও বলেছে। কম্পিউটিং শক্তি সহজে সীমান্ত পেরোয়, তাই নিজের দেশে ডেটা সেন্টার না থাকলেও অন্য দেশের অবকাঠামো ব্যবহার করে এআই চালানো সম্ভব। সমস্যা হলো, তখন আপনি ভাড়াটে। দাম, শর্ত ও তথ্য রাখার জায়গা ঠিক হয় অন্যের হাতে।

বাংলাদেশে প্রভাবটি ইতিমধ্যে দোকানে দেখা যাচ্ছে। ডেইলি স্টারের জানুয়ারির প্রতিবেদনে স্থানীয় বিক্রেতারা জানিয়েছিলেন, ল্যাপটপ ও ডেস্কটপের র‍্যামের দাম ২০০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ১৬ জিবি ডিডিআর৫ মডিউলের দাম অক্টোবরে প্রায় ৭,৮০০ টাকা থেকে ডিসেম্বরে প্রায় ২৮,৫০০ টাকায় ওঠে। প্রতিবেদনে অবশ্য একজন ক্রেতা স্থানীয় দামবৃদ্ধিকে পুরোপুরি যৌক্তিক মনে করেননি। যিনি প্রোগ্রামিং শিখছেন বা ফ্রিল্যান্সিং শুরু করতে চান, তাঁর কাছে একটি কম্পিউটারই প্রথম বিনিয়োগ। সেই খরচ বাড়লে শেখার প্রবেশপথই সংকুচিত হয়।

আপনার জন্য বাস্তব শিক্ষা

এই ব্যয় টেকসই কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকেরা একমত নন। কেউ একে চাহিদার প্রমাণ বলছেন, কেউ অতিরিক্ত নির্মাণের ঝুঁকি দেখছেন। ফরচুন উল্লেখ করেছে, এআই হার্ডওয়্যারের মূল্য দ্রুত কমে, যা ভবিষ্যতে বড় খরচ হয়ে ফিরতে পারে। ভবিষ্যৎ আমরা কেউ নিশ্চিত জানি না।

তবে কয়েকটি বিষয় এখনই কাজে লাগে। আমাদের মতে, নতুন কম্পিউটার কেনার আগে দরকারটা ভালো করে হিসাব করুন, কারণ অনেক শেখার কাজ এখন ক্লাউড ও ব্রাউজারেই সম্ভব। ক্লাউড কীভাবে কাজ করে, খরচ কীভাবে হিসাব হয়, ছোট মডেল কীভাবে চালানো যায়, এই জ্ঞান ভবিষ্যতে আরও মূল্যবান হতে পারে। আর সংখ্যা দেখলে প্রশ্ন করুন: এটি কি ঘোষণা, পূর্বাভাস, নাকি প্রকৃত খরচ?

সূত্র