আপনি যখন ChatGPT-তে একটা প্রশ্ন টাইপ করে এন্টার চাপেন, তখন কি কখনো ভেবেছেন সেই একটা উত্তরের পেছনে কতটা বিদ্যুৎ পুড়ছে? সংখ্যাটা শুনলে চমকে যাবেন — একটা একক ChatGPT প্রশ্ন গুগল সার্চের তুলনায় প্রায় দশ গুণ বেশি বিদ্যুৎ খরচ করে, এমনটাই অনুমান করছে IEA-সহ একাধিক গবেষণা। আর এই একটা প্রশ্নই বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয় — এটাই এখন বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টারের শক্তি-ক্ষুধার আসল চেহারা।
আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (IEA)-এর "Electricity 2024" প্রতিবেদন বলছে, ২০২২ সালে বিশ্বের ডেটা সেন্টারগুলো প্রায় ৪৬০ টেরাওয়াট-ঘণ্টা (TWh) বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস আরও চমকপ্রদ — ২০২৬ সাল নাগাদ এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ১,০৫০ TWh-এ পৌঁছাবে, যা পুরো জাপানের বার্ষিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের কাছাকাছি। এই বিপুল বৃদ্ধির পেছনে একটাই বড় কারণ — এআই। GPT-4 প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ ছিল আনুমানিক ৫০ গিগাওয়াট-ঘণ্টা। এই সংখ্যাগুলো একসঙ্গে বসালে বোঝা যায়, আমরা যে "ফ্রি" এআই টুল ব্যবহার করছি, তার একটা বাস্তব শক্তি-মূল্য আছে — শুধু আমরা সেটা দেখতে পাই না।
নিউক্লিয়ারের দিকে ঝুঁকছে বিগ টেক — এটা কি শেষমেশ স্বীকারোক্তি?
কয়েক বছর আগেও যেসব কোম্পানি নিজেদের "১০০% নবায়নযোগ্য" তকমায় মুড়ে রাখত, তারাই এখন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেনার দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করছে। আমার কাছে এটা একরকম নীরব স্বীকারোক্তি — নবায়নযোগ্য শক্তি একা এআই-এর ক্ষুধা মেটাতে যথেষ্ট নয়।
- Microsoft + Constellation Energy: পেনসিলভানিয়ার ঐতিহাসিক Three Mile Island Unit 1 পুনরায় চালুর চুক্তি (৮৩৫ মেগাওয়াট)
- Amazon + Talen Energy: Susquehanna পারমাণবিক কেন্দ্রের পাশে ডেটা ক্যাম্পাসের জন্য ৬৫০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি
- Google + Kairos Power: ছোট মডুলার রিয়্যাক্টর (SMR) থেকে বিদ্যুৎ কেনার সমঝোতা
- Meta: পারমাণবিক শক্তি অংশীদারদের জন্য RFP (প্রস্তাব আহ্বান) ঘোষণা
এক দশক আগে যা অকল্পনীয় শোনাত, আজ সেটাই বাস্তবতা — নবায়নযোগ্য যথেষ্ট নয়, ২৪/৭ পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতের জন্য পারমাণবিক শক্তি ছাড়া উপায় নেই, অন্তত আপাতত।
PUEPUEডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ-দক্ষতা মাপার মান, মোট বিদ্যুৎ ভাগ প্রকৃত আইটি ব্যবহারে ভাগ করে পাওয়া যায় নামের সংখ্যাটা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ডেটা সেন্টারের দক্ষতা মাপার মান হলো PUE (Power Usage Effectiveness) — মোট বিদ্যুৎ ভাগ আইটি সরঞ্জামে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ। আদর্শ মান ১.০০, বাস্তবে যা প্রায় অসম্ভব। শিল্প-গড় ২০২৩ সালে ছিল প্রায় ১.৫৮, অথচ Google, Meta, Amazon-এর মতো হাইপারস্কেলাররাহাইপারস্কেলাররাবিপুল স্কেলে ক্লাউড ও ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারী বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানি নিজেদের উন্নত নকশায় ১.১০ থেকে ১.২০-এর মধ্যে চলতে পারছে। এই পার্থক্যটা ছোট মনে হলেও, বিশাল স্কেলে এটাই লাখ লাখ ডলারের পার্থক্য গড়ে দেয়।
বাতাস আর কুলাচ্ছে না — লিকুইড কুলিং কি এখন বাধ্যবাধকতা?
ঐতিহ্যগতভাবে ডেটা সেন্টার বায়ু দিয়ে ঠান্ডা রাখা হতো। কিন্তু NVIDIA H100, H200 এবং সর্বশেষ Blackwell জিপিইউজিপিইউগ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট — এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও চালাতে ব্যবহৃত বিশেষ দ্রুতগতির প্রসেসর সমৃদ্ধ এআই র্যাকগুলোর তাপ-ঘনত্ব এতটাই বেশি যে বাতাসে ঠান্ডা রাখা আর বাস্তবসম্মত নয়। তাই লিকুইড কুলিং — সরাসরি চিপে শীতল তরল চালানোর প্রযুক্তি — দ্রুত মূলধারায় ঢুকে পড়ছে। এতে তাপ সরানোর দক্ষতা বাড়ে, বিদ্যুৎ খরচ কমে, আর একই জায়গায় আরও বেশি জিপিইউ বসানো যায়। এআই র্যাক যত ঘন হচ্ছে, লিকুইড কুলিং তত বিকল্প নয়, বরং বাধ্যবাধকতা হয়ে উঠছে।
পানির প্রশ্নটা আমরা কেন এড়িয়ে যাই?
কুলিংয়ের জন্য শুধু বিদ্যুৎ নয়, পানিও লাগে — অনেক। Google তাদের ২০২৪ সালের পরিবেশগত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২৩ সালে তাদের ডেটা সেন্টার ও অফিস সব মিলিয়ে প্রায় ২৪০০ কোটি লিটার পানি ব্যবহার করেছে। মরুভূমি বা খরাপীড়িত অঞ্চলে এটা শুধু পরিসংখ্যান নয়, একটা গুরুতর নৈতিক প্রশ্ন — আমরা এআই-এর সুবিধা নিচ্ছি, অথচ তার পানির মূল্য দিচ্ছে অন্য কেউ।
বাংলাদেশ কি এই দৌড়ে থাকতে পারবে?
বাংলাদেশে ডেটা সেন্টার শিল্প এখনো ছোট, কিন্তু দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে অবস্থিত Bangladesh Data Center Company Limited (BDCCL)-এর Tier-IVTier-IVসর্বোচ্চ মাত্রার নির্ভরযোগ্যতা ও রিডানডেন্সি নিশ্চিতকারী ডেটা সেন্টার শ্রেণিবিন্যাস মান ন্যাশনাল ডেটা সেন্টার আমাদের ডিজিটাল সরকারি সেবার ব্যাকবোন হিসেবে কাজ করছে, এর পাশাপাশি চালু হয়েছে Meghna Data Centerসহ কয়েকটি বেসরকারি সুবিধা। কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার জায়গা হলো — আমাদের বিদ্যুৎ গ্রিড এখনো বড় অংশে গ্যাস-নির্ভর, আর গ্রীষ্মে লোডশেডিং আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়। ব্যাকআপ ডিজেল জেনারেটরের উপর ভরসা করে টেকসই ডেটা সেন্টার গড়ে তোলা যায় না — দরকার সৌর মাইক্রোগ্রিডসৌর মাইক্রোগ্রিডছোট পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহকারী স্বয়ংসম্পূর্ণ বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক, বড় ব্যাটারি-ব্যাঙ্ক এবং গ্রিন গ্রিড সংযোগ। ঢাকার গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় দক্ষ কুলিং ডিজাইন ছাড়া আমাদের PUE দুইয়ের ঘরেই আটকে থাকবে, যেখানে বিশ্বের সেরারা দেড়ের নিচে নেমে গেছে।
এখানে একটা নীতিগত সুযোগও লুকিয়ে আছে বলে আমার বিশ্বাস — বাংলাদেশ যদি সত্যিই দক্ষিণ এশিয়ার একটা আঞ্চলিক ক্লাউড হাব হতে চায়, তাহলে গ্রিন ডেটা সেন্টার ছাড়া বিদেশি ক্লায়েন্ট আকর্ষণ করা কঠিন হবে। ইউরোপীয় ও জাপানি ক্রেতারা এখন নিজেদের ভেন্ডরদের কার্বন-রিপোর্টিংকার্বন-রিপোর্টিংপ্রতিষ্ঠানের কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ হিসাব করে প্রকাশ করার প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক করছেন — অর্থাৎ, টেকসইতা এখন আর ঐচ্ছিক সৌজন্য নয়, বরং ব্যবসা পাওয়ার শর্ত।
এআই যত বাড়ছে, ডেটা সেন্টারের শক্তির প্রশ্নও ততই জরুরি হয়ে উঠছে। এটা শুধু পরিবেশ-সচেতনতার প্রশ্ন নয় — এটা বাজারে টিকে থাকারও প্রশ্ন। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের ডেটা সেন্টার যদি শুরু থেকেই উচ্চ-দক্ষতার কুলিং, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ চুক্তি ও বুদ্ধিদীপ্ত আর্কিটেকচার বেছে নেয়, তাহলে পরবর্তী ডিজিটাল অর্থনীতির দৌড়ে আমরাও জায়গা করে নিতে পারব — শুধু দর্শক হয়ে থাকতে হবে না।