ধরুন আপনি চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে আছেন, হাতে পাঁচ টাকার নোট নেই, কিন্তু পকেটে ফোন আছে। দশ বছর আগে এই দৃশ্য কল্পনা করাই কঠিন ছিল — অথচ আজ এটা আমাদের রোজকার বাস্তবতা। বাংলাদেশ সরকারের স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১ রূপকল্পে লক্ষ্য বেঁধে দেওয়া হয়েছে, ২০২৭ সালের মধ্যে ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ে তোলার। প্রশ্নটা হলো, আমরা কি সত্যিই সেই লক্ষ্যের কাছাকাছি, নাকি এখনো অনেকটা পথ বাকি?
মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (MFS)মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (MFS)ব্যাংক ছাড়াই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে টাকা লেনদেনের সেবা, যেমন বিকাশ ও নগদ তো আমাদের হাতের মুঠোয় এসে গেছে অনেক আগেই। কিন্তু এখন গল্পটা আরেক ধাপ এগিয়েছে — অ্যাপ-ভিত্তিক ডিজিটাল ওয়ালেট, ব্যাংক-চালিত কিউআর স্ট্যান্ডার্ড, এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব ডিজিটাল মুদ্রার (CBDC)ডিজিটাল মুদ্রার (CBDC)কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক জারি করা দেশের মুদ্রার সরকারি ডিজিটাল সংস্করণ পাইলট পরিকল্পনা পর্যন্ত। আমার মতে, এই যাত্রাটা বোঝার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো টুকরো টুকরো অগ্রগতিগুলোকে একসঙ্গে বসিয়ে দেখা — তাহলেই বোঝা যাবে আমরা আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে।
MFS ছাড়িয়ে অ্যাপ-ভিত্তিক ওয়ালেট — নতুন প্রতিযোগিতা কি সত্যিই দরকার ছিল?
বিকাশ-নগদ-রকেটের বাইরে একটি নতুন স্তর দ্রুত গড়ে উঠছে — অ্যাপ-কেন্দ্রিক ডিজিটাল ওয়ালেট। আমি মনে করি এই প্রতিযোগিতা আসলে ভালো লক্ষণ, কারণ একচেটিয়া বাজারে উদ্ভাবন থমকে যায়।
- Upay — ইউসিবি ফিনটেকের উদ্যোগ।
- TAP — TAP Pay Services-এর নতুন প্ল্যাটফর্ম।
- Tally Khata — ছোট দোকান ও এসএমই-এর জন্য ডিজিটাল খাতা ও পেমেন্ট।
- iPay — বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল ওয়ালেটগুলোর একটি।
- D-Money — ফিনটেক লাইসেন্সধারী ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম।
কিন্তু শুধু নতুন অ্যাপ আসাটাই যথেষ্ট নয় — আসল প্রশ্ন হলো, এই ওয়ালেটগুলো একে অপরের সঙ্গে কতটা ভালোভাবে কথা বলতে পারে।
Bangla QR: ছোট্ট একটা স্টিকার, অথচ কতটা বদলে দিল দোকানদারের অভিজ্ঞতা
২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক Bangla QR চালু করার আগে পর্যন্ত প্রতিটি প্ল্যাটফর্মের জন্য আলাদা কিউআর কোড দরকার হতো — একজন দোকানদারকে বিকাশের জন্য একটা, নগদের জন্য আরেকটা, ব্যাংকের জন্য তৃতীয় স্টিকার টাঙাতে হতো। আমার চোখে এটা ছিল অপ্রয়োজনীয় জটিলতা, যা দোকানদারদের বিভ্রান্ত করত। Bangla QR এসে এই সমস্যার একটা সহজ সমাধান দিয়েছে — একটি মাত্র কিউআর স্টিকার স্ক্যান করেই ব্যবহারকারী বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাপ অথবা MFS (যেমন বিকাশ, নগদ) থেকে মার্চেন্টকে পেমেন্ট করতে পারেন। ছোট পরিবর্তন মনে হলেও, অবকাঠামোগতভাবে এটা একটা বড় অগ্রগতি।
পর্দার আড়ালে যে অবকাঠামো কাজ করে, সেটা নিয়ে আমরা কতটা ভাবি?
আমরা যখন এক ট্যাপে টাকা পাঠাই, তখন কল্পনাও করি না যে তার পেছনে কতগুলো সিস্টেম একসঙ্গে কাজ করছে। বাংলাদেশে এই মেরুদণ্ডের কাজ করছে:
- BACHBACHব্যাংকগুলোর মধ্যে চেক ও লেনদেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষ্পত্তি করার কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা — Bangladesh Automated Clearing House
- BEFTN — ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার নেটওয়ার্ক
- RTGSRTGSবড় অঙ্কের আন্তঃব্যাংক লেনদেন সঙ্গে সঙ্গে ও পৃথকভাবে নিষ্পত্তি করার পদ্ধতি — Real-Time Gross Settlement
- NPSB — National Payment Switch Bangladesh, যা আন্তঃব্যাংক এটিএম ও পিওএসপিওএসদোকানে কার্ড বা মোবাইল দিয়ে পেমেন্ট নেওয়ার যন্ত্র বা লেনদেন বিন্দু লেনদেন নিষ্পত্তি করে।
এই অবকাঠামো যত অদৃশ্য, ততই তার গুরুত্ব বেশি — কারণ এটাই ঠিক করে দেয় গোটা সিস্টেম আসলে কতটা নির্ভরযোগ্য।
CBDC: আমরা কি সত্যিই নিজস্ব ডিজিটাল টাকা পেতে যাচ্ছি?
২০২৩ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার যখন ঘোষণা দিলেন যে একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা (CBDC) চালুর সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে, তখন আমার প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল সতর্ক আশাবাদ। এটি বাস্তবায়িত হলে টাকার একটি ডিজিটাল রূপ সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়বদ্ধতায় জনসাধারণের কাছে পৌঁছাবে — ব্যাংক বা MFS-এর মাধ্যমে ঘুরে নয়। তবে আমাদের একা এই পথে হাঁটতে হবে না। ভারতের e₹ (ডিজিটাল রুপি), চীনের e-CNY এবং নাইজেরিয়ার eNaira ইতিমধ্যে এই পথে হেঁটেছে, আর তাদের ভুল-শুদ্ধ দুটো থেকেই আমরা শিখতে পারি।
ই-কমার্স কি অভ্যাস বদলাচ্ছে, নাকি শুধু শহরেই আটকে আছে?
Daraz, Chaldal, Pickaboo, Foodpanda-র মতো প্ল্যাটফর্মগুলো ডিজিটাল পেমেন্টকে আমাদের রোজকার অভ্যাসে পরিণত করেছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। ছাড়, ক্যাশব্যাক আর সহজ রিফান্ডের লোভে তরুণ শহুরে ব্যবহারকারীরা কার্ড ও মোবাইল ওয়ালেটে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো — এই অভ্যাস কি গ্রামে পৌঁছাচ্ছে? বাস্তবতা হলো, গ্রামাঞ্চলের অনেক ছোট দোকানে কিউআর-স্টিকার এখনো দুর্লভ দৃশ্য। যতক্ষণ না এই ব্যবধান ঘোচে, ততক্ষণ "ক্যাশলেস বাংলাদেশ" আসলে "ক্যাশলেস ঢাকা" হয়েই থেকে যাবে।
ভারত-চীনের পাশে দাঁড় করালে আমরা আসলে কোথায়?
তুলনাটা একটু অস্বস্তিকর, কিন্তু জরুরি। ভারতের UPI (Unified Payments Interface)UPI (Unified Payments Interface)ভারতের একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এক অ্যাপে সংযুক্ত করে তাৎক্ষণিক লেনদেনের ব্যবস্থা এখন মাসে প্রায় এক হাজার কোটি লেনদেন সামলায় — সম্ভবত বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল রিটেইল ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম। চীনের Alipay ও WeChat Pay প্রায় সম্পূর্ণ শহুরে পেমেন্ট নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে। এই তুলনায় বাংলাদেশ এখনো অনেকটা পথ বাকি রেখেছে, এটা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই। তবে হতাশ হওয়ার কারণ নেই — একটি সুসংগঠিত কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং Bangla QR-এর মতো অবকাঠামো ইতিবাচক ভিত্তি তৈরি করেছে। ভিত্তি থাকলে দ্রুত এগোনো সম্ভব, প্রশ্ন হলো ইচ্ছাশক্তির।
তাহলে বাধা আসলে কোথায়?
আমার বিচারে চারটি ক্ষেত্রে একযোগে অগ্রগতি না হলে "ক্যাশলেস সোসাইটি" শুধু একটি স্লোগান হিসেবেই থেকে যাবে — গ্রামীণ পর্যায়ে ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার বাড়ানো, সাইবার ঝুঁকি ও ফিশিং থেকে সুরক্ষা, মার্চেন্ট পর্যায়ে কিউআর গ্রহণের সংস্কৃতি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ব্যবহারকারীর আস্থা। এই চারটির একটাও একা ব্যাংক বা একা সরকার সমাধান করতে পারবে না — প্রয়োজন ব্যাংক, MFS, সরকার, মোবাইল অপারেটর ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক সমন্বয়।
বাংলাদেশের ডিজিটাল ওয়ালেট বিপ্লব এখনো একটি কাজ-চলছে প্রকল্প, আর সেটা মেনে নেওয়াই সৎ বিশ্লেষণের প্রথম শর্ত। দৃশ্যমান অগ্রগতি আছে, অবকাঠামো গড়ে উঠছে, মানুষের অভ্যাস বদলাচ্ছে — কিন্তু গতি যথেষ্ট কিনা সেই বিতর্ক থেকেই যায়। পরবর্তী পাঁচ বছর আমাদের জন্য নির্ধারক — এই সময়েই আমরা দেখব, "নগদ-মুক্ত বাংলাদেশ" সত্যিই বাস্তবতা হয়ে উঠছে, নাকি থেকে যাচ্ছে নীতিগত আকাঙ্ক্ষার আরেকটি অধ্যায় হয়ে।