ধরুন আপনি একজন বিনিয়োগকারী, আর মাত্র এক সপ্তাহ আগে যে প্রতিষ্ঠানে আপনি টাকা রেখেছেন তার বাজারমূল্য ছিল ৩,২০০ কোটি ডলার — আর সাত দিন পরে সেই প্রতিষ্ঠানই দেউলিয়া। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগে, কিন্তু এটাই ঘটেছিল ঠিক তিন বছর আগে, ২০২২ সালের ১১ নভেম্বর। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ এফটিএক্স (FTX) এবং এর প্রায় ১৩০টি সহযোগী প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে Chapter 11 দেউলিয়াত্বেরChapter 11 দেউলিয়াত্বেরযুক্তরাষ্ট্রের আইনে প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসা চালু রেখে ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া দেউলিয়াত্ব প্রক্রিয়া আবেদন জমা দেয়। ৩০ বছর বয়সী প্রতিষ্ঠাতা স্যাম ব্যাংকম্যান-ফ্রাইড (SBF), যাকে অনেকে "ক্রিপ্টোর ওয়ারেন বাফেট" বলতেন, তার গড়ে তোলা সাম্রাজ্য কার্যত রাতারাতি মিলিয়ে যায়।

২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এফটিএক্স দ্রুত বাড়তে বাড়তে ২০২১-২২ সালে বিটকয়েন ও ডেরিভেটিভ ট্রেডিংয়ের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। সেলিব্রিটি এন্ডোর্সমেন্ট, সুপার বোল বিজ্ঞাপন, এমনকি মিয়ামি হিটস স্টেডিয়ামের নামকরণ স্বত্ব পর্যন্ত কিনে নিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। এত জাঁকজমক দেখেই বোঝা উচিত ছিল — যেকোনো ব্যবসা যখন পণ্যের চেয়ে ইমেজ তৈরিতে বেশি মনোযোগ দেয়, তখন কোথাও একটা ফাঁক থেকে যায়। কিন্তু তখন কেউ সেটা বলার সাহস দেখাননি।

একটা প্রতিবেদন কীভাবে গোটা সাম্রাজ্য ধসিয়ে দিল?

২০২২ সালের ২ নভেম্বর সংবাদমাধ্যম CoinDesk একটা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে দেখানো হয় SBF-এর অন্য প্রতিষ্ঠান Alameda Research-এর ব্যালেন্স শিটের বড় অংশ আসলে FTX-এর নিজস্ব টোকেন FTTFTTএফটিএক্স নিজে তৈরি করা ও ইস্যু করা নিজস্ব ক্রিপ্টো টোকেন দিয়ে ভর্তি — অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটার "সম্পদ" আসলে নিজেরই ছাপানো কাগজ। প্রতিদ্বন্দ্বী এক্সচেঞ্জ Binance-এর সিইও চ্যাংপেং ঝাও (CZ) ৬ নভেম্বর ঘোষণা দেন, তারা তাদের কাছে থাকা FTT বিক্রি করবেন। এই একটা ঘোষণাই যথেষ্ট ছিল — শুরু হয়ে যায় ব্যাংক-রানব্যাংক-রানআস্থা হারিয়ে একসঙ্গে অনেক গ্রাহক তাদের সব টাকা তুলে নেওয়ার চেষ্টা।

মাত্র ৭২ ঘণ্টায় ব্যবহারকারীরা ৬০০ কোটি ডলারের বেশি টাকা তোলার চেষ্টা করেন। FTX তা দিতে ব্যর্থ হয় — কারণ পরে জানা যায়, গ্রাহকদের জমা টাকার প্রায় ৮০০ কোটি ডলার গোপনে Alameda Research-এ পাঠানো হয়েছিল। ভাবুন তো — যে টাকা আপনি নিরাপদ মনে করে এক্সচেঞ্জে রেখেছিলেন, সেটা আসলে অন্য একটা কোম্পানির ফাটকা ব্যবসায় খাটছিল আপনার অজান্তেই। এটাই ছিল আসল বিশ্বাসঘাতকতা।

বিচার কি ন্যায়বিচার হয়েছে?

২০২২ সালের ১২ ডিসেম্বর বাহামাস থেকে SBF-কে গ্রেফতার করা হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হয়। ২০২৩ সালের ৩ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত নিউ ইয়র্কের আদালতে চলে বিচার। জুরি তাকে ৭টি অভিযোগেই দোষী সাব্যস্ত করেন — ওয়্যার ফ্রড, সিকিউরিটিজ ফ্রড ও মানি লন্ডারিংসহ। ২০২৪ সালের ২৮ মার্চ বিচারক লুইস ক্যাপলান তাকে ফেডারেল কারাগারে ২৫ বছরের সাজা দেন। সংখ্যাটা শুনতে কঠোর মনে হতে পারে, কিন্তু যখন আপনি ভাবেন যে গ্রাহকদের প্রায় ৮০০ কোটি ডলার নিয়ে খেলা হয়েছিল, তখন এই সাজাকে অতিরিক্ত মনে হয় না।

একটা এক্সচেঞ্জ ধসল, পুরো বাজার কেন কাঁপল?

FTX-এর পতন কেবল একটা এক্সচেঞ্জের মৃত্যু ছিল না — এটা ডেকে আনে ডমিনো-এফেক্ট, আর সেটাই দেখিয়ে দেয় ক্রিপ্টো বাজারের প্রতিষ্ঠানগুলো একে অপরের সঙ্গে কতটা জড়িয়ে ছিল।

  • Genesis, BlockFi, Voyager — তিনটাই দেউলিয়া ঘোষণা করে।
  • বিশ্বজুড়ে ক্রিপ্টো বাজার কয়েক সপ্তাহে প্রায় ২০,০০০ কোটি ডলার মূলধন হারায়।
  • বিটকয়েনের দাম নেমে আসে ১৬,০০০ ডলারের নিচে।
  • খুচরা বিনিয়োগকারীদের এক্সচেঞ্জের ওপর আস্থা ভেঙে পড়ে; অনেকে স্ব-রক্ষিত (self-custody) ওয়ালেটেস্ব-রক্ষিত (self-custody) ওয়ালেটেএক্সচেঞ্জের বদলে ব্যবহারকারী নিজে চাবি সংরক্ষণ করে এমন ক্রিপ্টো ওয়ালেট সরে যান।

এই তালিকাটা দেখলেই বোঝা যায়, একটা প্রতিষ্ঠানের অসততা কীভাবে হাজারো নিরপরাধ বিনিয়োগকারীর সঞ্চয় কেড়ে নিতে পারে।

নিয়ন্ত্রণ কি সত্যিই এসেছে, নাকি কেবল কাগজে?

ঘটনাটা বিশ্বজুড়ে ক্রিপ্টো নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পরিবর্তন আনে — আর এটাকে আমি একটা দেরিতে হলেও প্রয়োজনীয় শিক্ষা বলব। ইউরোপীয় ইউনিয়নের MiCA (Markets in Crypto-Assets)MiCA (Markets in Crypto-Assets)ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রিপ্টো সম্পদ নিয়ন্ত্রণের প্রথম বিস্তৃত আইনি কাঠামো প্রবিধান ২০২৪ সাল থেকে ধাপে ধাপে কার্যকর হতে শুরু করে — বিশ্বের প্রথম বিস্তৃত ক্রিপ্টো কাঠামো। যুক্তরাষ্ট্রে FIT21 বিল ২০২৪ সালে প্রতিনিধি পরিষদে পাস হয়, ক্রিপ্টো-সম্পদ নিয়ন্ত্রণে SEC ও CFTC-এর সীমা নির্ধারণের চেষ্টা চলছে। প্রশ্ন হলো — এই নিয়ন্ত্রণ কি আসলে বিনিয়োগকারীকে রক্ষা করবে, নাকি শুধু কাগজে-কলমে থেকে যাবে? সেই উত্তরটা সময়ই দেবে।

বাংলাদেশে আমরা কী শিখলাম?

বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক আগে থেকেই ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন ও ধারণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে রেখেছে — বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৪৭-এর আওতায় এটা অবৈধ লেনদেন হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু বাস্তবতাটা এত সহজ ছিল না। ২০১৮-২০২২ সময়কালে বাংলাদেশের অনেক ফ্রিল্যান্সার আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে কাজের বিল Payoneer বা PayPal-এর বিকল্প হিসেবে USDT (টিথার) বা বিটকয়েনে নিতেন, পরে সেটাকে পি-টু-পি প্ল্যাটফর্মেপি-টু-পি প্ল্যাটফর্মেমধ্যস্থতাকারী ছাড়া ব্যবহারকারীদের সরাসরি একে অপরের সঙ্গে লেনদেনের ব্যবস্থা টাকায় রূপান্তর করতেন। নিয়মকে পাশ কাটিয়ে বাস্তব প্রয়োজন মেটানোর এই চেষ্টাটা আমাদের অনেকেরই পরিচিত গল্প।

এফটিএক্স ধস আমাদের তরুণ বিনিয়োগকারী ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য একটা সাবধানবাণী হিসেবেই আসা উচিত। নিয়ন্ত্রণহীন এক্সচেঞ্জে বড় অঙ্কের সঞ্চয় জমা রাখার ঝুঁকি কতটা — এর চেয়ে পরিষ্কারভাবে আর কিছুতে বোঝা কঠিন। একইসঙ্গে CID ও BFIU পি-টু-পি ক্রিপ্টো লেনদেনে নজরদারি বাড়িয়েছে; সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক মামলাও হয়েছে। যারা এখনো ভাবছেন "আমার এক্সচেঞ্জের সঙ্গে এমন হবে না" — তাদের FTX-এর গ্রাহকদের গল্পটা একবার পড়া উচিত।

তিন বছর পর ক্রিপ্টো শিল্প অনেকটাই পরিণত হয়েছে — বিটকয়েন ইটিএফইটিএফশেয়ারবাজারে কেনাবেচাযোগ্য একটি তহবিল যা কোনো সম্পদের মূল্য অনুসরণ করে অনুমোদন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ, স্পষ্ট নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর দিকে অগ্রযাত্রা। তবুও FTX-এর গল্পটা মনে করিয়ে দেয় — নিয়ন্ত্রণ ছাড়া যেকোনো আর্থিক উদ্ভাবনই শেষমেশ বিনিয়োগকারীর টাকার ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। আর সেই ঝুঁকি নেওয়ার আগে দুইবার ভাবাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।