ধরুন আপনি একজন ডেভেলপার, আর ২০২২ সালের জুন মাসে আপনার আইডিইতেআইডিইতেপ্রোগ্রামারদের কোড লেখা, সম্পাদনা ও পরীক্ষা করার সমন্বিত সফটওয়্যার পরিবেশ হঠাৎ একটা ঘোস্ট টেক্সট ভেসে উঠল — পরের লাইনের কোড, নিজে থেকেই লেখা। প্রথমবার দেখলে অদ্ভুত লাগে, দ্বিতীয়বার আশ্চর্য লাগে, তৃতীয়বার থেকে আপনি আর ওটা ছাড়া কাজ করতে পারেন না। ২১ জুন ২০২২, মাইক্রোসফটের মালিকানাধীন গিটহাব আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করে গিটহাব কপাইলট (GitHub Copilot) — প্রায় এক বছরের টেকনিক্যাল প্রিভিউ শেষে সাধারণ ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত, ব্যক্তিগত ব্যবহারকারীর জন্য মাসে ১০ ডলার আর ব্যবসায়িক প্যাকেজ ১৯ ডলারে। ভিত্তিমডেলভিত্তিমডেলবিপুল ডেটায় প্রশিক্ষিত বড় এআই মডেল যার ওপর ভিত্তি করে অন্যান্য অ্যাপ্লিকেশন তৈরি হয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল ওপেনএআইয়ের Codex। তিন বছর পরে ফিরে তাকালে বোঝা যায়, এই একটা পণ্য আসলে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং পেশার চেহারাটাই বদলে দিয়েছে।
সংখ্যাগুলো নিজেরাই কথা বলে। গিটহাবের ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, কপাইলটের পেইড সাবস্ক্রাইবার ছাড়িয়েছে ১৮ লক্ষ, ৫০,০০০-এর বেশি প্রতিষ্ঠান এটি ব্যবহার করছে। মাইক্রোসফটের নিজস্ব গবেষণায় দেখা গেছে, কপাইলট ব্যবহার করা ডেভেলপাররা নির্দিষ্ট কাজ গড়ে প্রায় ৫৫ শতাংশ দ্রুত শেষ করেন। এই সংখ্যাটা শুনতে বিমূর্ত মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে এর মানে হলো — একই দলে কম মানুষ দিয়ে বেশি কাজ করানো সম্ভব, আর এটাই পরবর্তীতে শ্রমবাজারে যে টানাপোড়েন তৈরি করেছে, তার শিকড়।
একটা অটোকমপ্লিট থেকে সহকর্মী হয়ে ওঠার গল্প
কপাইলটের বিবর্তনটা লক্ষ্য করলে বোঝা যায় এআই টুল কীভাবে ধাপে ধাপে আরও গভীরে ঢুকে পড়ছে আমাদের কাজে। শুরুতে এটা ছিল নিছক একটা উন্নত অটোকমপ্লিট — আইডিইতে ঘোস্ট টেক্সট হিসেবে পরের কয়েক লাইনের কোড প্রস্তাব করত, ব্যস। কিন্তু চ্যাটজিপিটি চালু হওয়ার পরপরই ২০২৩ সালের মার্চে গিটহাব ঘোষণা করে Copilot X রোডম্যাপ — চ্যাট, পুল-রিকোয়েস্ট সারাংশ, ভয়েস-চালিত কোডিং। জুলাইয়ে Copilot Chat প্রিভিউতে আসে; ডেভেলপাররা এখন আইডিইর ভেতরেই প্রশ্ন করতে পারেন, ভুল ডিবাগ করাতে পারেন, কোডের ব্যাখ্যা চাইতে পারেন।
২০২৪ সালে গিটহাব উন্মোচন করে Copilot Workspace-এর প্রিভিউ, আর এখানেই আসল পরিবর্তনটা ঘটে। এটা আর শুধু পরের লাইনের সাজেশন দেয় না — পুরো টাস্ক বুঝে ফাইল তৈরি, সম্পাদনা ও টেস্ট চালানোর মতো এজেন্ট-পর্যায়েরএজেন্ট-পর্যায়েরশুধু পরামর্শ না দিয়ে নিজে থেকে একাধিক ধাপে কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম এআই ব্যবস্থা কাজ করে। মানে তিনটা স্পষ্ট ধাপে কপাইলট বদলে গেছে: সাজেশন থেকে কথোপকথন, কথোপকথন থেকে এজেন্ট। এই দিকটা যত এগোবে, "প্রোগ্রামার" শব্দের সংজ্ঞাটাও তত পাল্টাতে থাকবে বলেই আমার ধারণা।
ভিএস কোডের বাইরেও কেন ছড়াতে হলো?
প্রথম দিকে কপাইলট আটকে ছিল ভিজুয়াল স্টুডিও কোডে। কিন্তু বাজারের চাপ উপেক্ষা করার উপায় ছিল না — প্লাগইন এল জিটব্র্যান্ডস আইডিই (IntelliJ, PyCharm, WebStorm), Visual Studio, Neovim ও Azure Data Studio-তে। এই সম্প্রসারণটা তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশের বহু এনটারপ্রাইজ ডেভেলপার — বিশেষত যারা জাভা ও .NET পরিবেশে কাজ করেন — মূলত এই বিস্তৃতির পরেই কপাইলট গ্রহণ শুরু করেন। শুধু স্টার্টআপ-নির্ভর এআই টুল হলে এই গ্রহণের গতি অনেক ধীর হতো।
কপিরাইটের প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে না
সাফল্য যতটা দ্রুত এসেছে, আইনি জটিলতাও কম আসেনি — আর এটাই স্বাভাবিক, যখন একটা মডেল লক্ষ লক্ষ মানুষের লেখা কোড থেকে শিখে বড় হয়। ২০২২ সালের নভেম্বরে Doe v. GitHub নামে একটি ক্লাস-অ্যাকশন মামলা করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালতে। বাদীপক্ষের অভিযোগ, কপাইলট প্রশিক্ষণের সময় গিটহাবে থাকা ওপেন-সোর্স কোড ব্যবহৃত হয়েছে লাইসেন্সের শর্ত — যেমন GPL-এর অ্যাট্রিবিউশন ক্লজGPL-এর অ্যাট্রিবিউশন ক্লজওপেন-সোর্স লাইসেন্সের শর্ত যা মূল লেখকের কৃতিত্ব উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করে — লঙ্ঘন করে। মামলাটি এখনো গড়িয়ে চলছে, আর আমার মনে হয় এর রায় ভবিষ্যতে এআই মডেলের প্রশিক্ষণ তথ্য সংগ্রহের নিয়মকানুন নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
সমস্যাটা শুধু লাইসেন্স নিয়ে না। কপাইলট মাঝেমধ্যে সুরক্ষা-ত্রুটিযুক্ত কোড প্রস্তাব করে, লাইসেন্সবিহীনভাবে মূল প্রকল্পের হুবহু কোড তুলে আনে, কিংবা পুরোনো API ব্যবহার করে বসে। এজন্যই বড় প্রতিষ্ঠানগুলো কোড-রিভিউ ও স্ট্যাটিক অ্যানালাইসিসস্ট্যাটিক অ্যানালাইসিসকোড না চালিয়েই তার গঠন বিশ্লেষণ করে ত্রুটি ও নিরাপত্তা সমস্যা খুঁজে বের করার পদ্ধতি পাইপলাইনকে আগের চেয়ে অনেক কঠোর করেছে। এআই দ্রুত কোড লেখে ঠিকই, কিন্তু সেই কোডের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত মানুষকেই নিতে হয় — এই সত্যটা যত তাড়াতাড়ি আমরা মেনে নেব, ততই ভালো।
বাংলাদেশে কপাইলট আসলে কার উপকার করেছে?
বাংলাদেশে কপাইলটের প্রভাব দুই মেরুর, আর এই দুই মেরুই আমাদের সামনে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে। একদিকে, Programming Hero, Learning Bangladesh ও অন্যান্য বুটক্যাম্প এখন সরাসরি "এআই পেয়ার প্রোগ্রামিং" সেশন যুক্ত করেছে — শিক্ষার্থীরা শুরু থেকেই কপাইলটকে সহকর্মী হিসেবে ব্যবহার করতে শিখছেন। এটা ভালো খবর। কিন্তু অন্যদিকে, Upwork ও Fiverr-এ অনেক বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সার জানাচ্ছেন, তাদের কাজের গতি তিন-চার গুণ বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু CRUD অ্যাপCRUD অ্যাপতথ্য তৈরি, পড়া, হালনাগাদ ও মোছার সাধারণ কার্যক্রমভিত্তিক সফটওয়্যার অ্যাপ্লিকেশন বা সাধারণ স্ক্রিপ্টিংয়ের মতো এন্ট্রি-লেভেল কাজের দর পড়ে গেছে — কারণ ক্লায়েন্টরাও এখন বুঝে গেছেন কাজগুলো কতটা সহজ হয়ে উঠেছে।
তাহলে কারা এগিয়ে যাচ্ছেন? আমি যতটা দেখেছি, যারা এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছেন তারা সাধারণত:
- সিস্টেম ডিজাইন ও আর্কিটেকচারের দক্ষতা বাড়ানোয় মনোযোগ দিয়েছেন
- এআই-জেনারেটেড কোড রিভিউ ও সুরক্ষা অডিটে বিশেষজ্ঞ হয়েছেন
- ডোমেইন-নির্দিষ্ট সমাধান — ফিনটেক, হেলথটেক, ই-কমার্স ইন্টিগ্রেশন — দিতে শিখেছেন
অর্থাৎ যে কাজটা কপাইলট নিজে করতে পারে না, সেখানেই মূল্য বেড়েছে। বাকিটা ক্রমেই সস্তা হয়ে যাচ্ছে।
কপাইলট কি একা রাজত্ব করছে?
মোটেও না। কপাইলটের পথ ধরে এসেছে Cursor, Windsurf (আগে Codeium), Tabnine, Amazon Q Developer ও ওপেন-সোর্স Continue.dev। বিশেষত Cursor IDE খুব কম সময়ে ডেভেলপারদের প্রিয় হয়ে উঠেছে, কারণ এটি কোডবেসের ভেতরে বহু-ফাইল বোঝাপড়ায় এগিয়ে। তবু এন্টারপ্রাইজ অঙ্গনে কপাইলটের প্রভাব এখনো অটুট — বিশেষত মাইক্রোসফট ৩৬৫ ও Azure-নির্ভর সংস্থাগুলোর জন্য এটি এখনো স্বাভাবিক পছন্দ।
তিন বছর আগে কপাইলট ছিল কৌতূহলী কিছু ডেভেলপারের একটা এক্সপেরিমেন্ট। আজ এটি লক্ষ লক্ষ ইঞ্জিনিয়ারের দৈনন্দিন কর্মপ্রবাহের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশের ডেভেলপার সম্প্রদায়ের জন্য প্রশ্ন এখন আর "কপাইলট শিখব কি না" নয় — প্রশ্ন হলো, এআই সহকর্মীর পাশে কাজ করে নিজেকে কোন স্তরে নিয়ে যাওয়া যায়। যারা এই প্রশ্নের উত্তর এখনও খুঁজছেন না, তাদের জন্য সময়টা ফুরিয়ে আসছে।