ধরুন আজ আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, আপনার NID, আপনার ই-পাসপোর্ট — সব কিছুর নিরাপত্তা দাঁড়িয়ে আছে একটা গাণিতিক সমস্যার ওপর, যেটা ভাঙা এখনকার কম্পিউটার দিয়ে কার্যত অসম্ভব। এখন প্রশ্ন করুন — যদি একদিন এমন একটা মেশিন আসে যেটার কাছে এই ‘অসম্ভব’ সমস্যাটাই মামুলি হয়ে যায়, তাহলে কী হবে? এই প্রশ্নটাকে আর কল্পবিজ্ঞান বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ কমে আসছে, আর তার একটা বড় কারণ ২০২৩ সালের ৪ ডিসেম্বর নিউ ইয়র্কে আইবিএমের এক ঘোষণা।

সেদিন IBM Quantum Summit-এ প্রতিষ্ঠানটি উন্মোচন করে ১,১২১ কিউবিটেরকিউবিটেরকোয়ান্টাম কম্পিউটারের তথ্য-এককের নাম, যা একই সাথে একাধিক অবস্থায় থাকতে পারে “Condor” কোয়ান্টাম প্রসেসর — ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো সুপারকন্ডাক্টিং কোয়ান্টাম চিপ হাজার কিউবিটের মাইলফলক অতিক্রম করল। কিন্তু আমার কাছে সেদিনের আসল খবরটা Condor ছিল না — ছিল একই দিনে ঘোষিত ১৩৩ কিউবিটের আরেকটা প্রসেসর, “Heron”। কেন? কারণ Heron-এর লক্ষ্য কিউবিটসংখ্যা বাড়ানো নয়, ত্রুটির হার (error rate) কমানো। আইবিএমের ভাষ্যমতে, আগের প্রজন্মের Eagle প্রসেসরের তুলনায় Heron প্রায় তিন গুণ কম ত্রুটি তৈরি করে। সংখ্যার দৌড় দেখতে চমকপ্রদ লাগে ঠিকই, কিন্তু ব্যবহারিক কোয়ান্টাম হিসাবের জন্য আসল লড়াইটা মানের — আর সেই লড়াইয়ে এখন সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

এক বিশাল চিপ, নাকি বহু ছোট চিপের নেটওয়ার্ক?

Condor যতটা প্রতীকী, Heron ততটাই ব্যবহারিক — আর এই ব্যবহারিকতার ভিত্তিতেই আইবিএম ঘোষণা করেছে নতুন IBM Quantum System Two, একটা মডুলার স্থাপত্য যেখানে একাধিক Heron চিপ একসঙ্গে যুক্ত করে বৃহত্তর কোয়ান্টাম কম্পিউটার বানানো সম্ভব। আমার মতে এটাই আসল কৌশলগত সিদ্ধান্ত — একটা বিশাল একক চিপ বানানোর চেষ্টা না করে বহু ছোট চিপের সমন্বিত নেটওয়ার্ক তৈরি করা। প্রতিষ্ঠানটির ২০৩৩ সালের রোডম্যাপ বলছে, তারা এক লাখের বেশি ত্রুটি-সংশোধিত (error-corrected)ত্রুটি-সংশোধিত (error-corrected)একাধিক ভৌত কিউবিট মিলিয়ে তৈরি স্থিতিশীল কিউবিট, যেখানে গণনার ত্রুটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত ও সংশোধন করা হয় কিউবিট অর্জনের লক্ষ্যে এগোচ্ছে। এখানে একটা জিনিস স্পষ্ট করা দরকার — ত্রুটি-সংশোধন মানে হাজার হাজার ফিজিক্যাল কিউবিট খরচ করে হাতেগোনা কয়েকটা স্থিতিশীল লজিক্যাল কিউবিট তৈরি করা, যেটা দিয়েই আসলে বাস্তব সমস্যা সমাধান সম্ভব। এই একটা তথ্যই বলে দেয়, কেন “হাজার কিউবিট” শুনতে যতটা বিশাল লাগছে, বাস্তব প্রয়োগযোগ্যতা তার চেয়ে অনেক দূরে।

আইবিএম একা নয় — বরং প্রতিযোগিতাই আসল গল্প

আইবিএমের এই ঘোষণাকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ভাবলে ভুল হবে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে গুগল উন্মোচন করে তাদের “Willow” প্রসেসর — মাত্র ১০৫ কিউবিট, কিন্তু ত্রুটি-সংশোধনের দিক থেকে ঐতিহাসিক অগ্রগতি, যেখানে কিউবিট যত বাড়ানো হয়েছে, ত্রুটি তত কমেছে। এটা লক্ষণীয়, কারণ আইবিএম আর গুগল দুই ভিন্ন পথে হাঁটছে অথচ একই সমস্যার সমাধান খুঁজছে। বাজারে আরও আছে:

  • IonQ — ট্র্যাপড-আয়ন প্রযুক্তি, উচ্চ নির্ভুলতার দাবিদার
  • PsiQuantum — ফোটনিক কিউবিট, ঘরের তাপমাত্রায় কাজের সম্ভাবনা নিয়ে এগোচ্ছে
  • Quantinuum — Honeywell ও Cambridge Quantum-এর যৌথ উদ্যোগ

প্রত্যেকে ভিন্ন প্রযুক্তির পথে হাঁটছে, আর সত্যি বলতে, কোনটা শেষ পর্যন্ত জিতবে সেটা এখনই নিশ্চিত করে বলার সাহস আমি করব না — এই খাতে অতীতে বহুবার ‘নিশ্চিত বিজয়ী’র ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

‘কোয়ান্টাম সুপ্রিম্যাসি’ আসলেই এসেছে, নাকি বিপণনের কৌশল?

শিল্পে এখন সবচেয়ে বিতর্কিত প্রশ্ন হলো — ব্যবহারিক “কোয়ান্টাম অ্যাডভান্টেজ”“কোয়ান্টাম অ্যাডভান্টেজ”এমন কোনো বাস্তব সমস্যা কোয়ান্টাম কম্পিউটার সাধারণ কম্পিউটারের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে দ্রুত সমাধান করছে কি না সত্যিই এসেছে কি না। অর্থাৎ এমন কোনো বাস্তব সমস্যা কি আছে, যেটা সাধারণ সুপারকম্পিউটার দিয়ে সমাধান করার চেয়ে কোয়ান্টাম মেশিন দিয়ে উল্লেখযোগ্য দ্রুত সমাধান করা যাচ্ছে? বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জোরালো দাবি করলেও স্বতন্ত্র গবেষকরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখিয়েছেন, ধ্রুপদী অ্যালগরিদম একটু উন্নত করলেই সেই “অ্যাডভান্টেজ” মুছে যায়। আমার পর্যবেক্ষণ হলো — এই খাতে এখনো বিপণন আর বাস্তব অর্জনের মধ্যে দূরত্বটা বড়, আর সেই দূরত্ব নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।

সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন: আজকের এনক্রিপশন কতদিন টিকবে?

কোয়ান্টাম কম্পিউটারের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ভয়াবহ প্রভাব ক্রিপ্টোগ্রাফির ওপর, আর এটাই আমার কাছে গোটা প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্তমানে ইন্টারনেট নিরাপত্তায় ব্যবহৃত RSA ও ECCRSA ও ECCবর্তমান ইন্টারনেট নিরাপত্তার ভিত্তি দুটি জনপ্রিয় এনক্রিপশন পদ্ধতি, যা বড় সংখ্যা গুণনীয়ক বিশ্লেষণের কাঠিন্যের উপর নির্ভরশীল অ্যালগরিদম যথেষ্ট বড় কোয়ান্টাম কম্পিউটারে ভেঙে ফেলা সম্ভব — এটা Shor-এর অ্যালগরিদমShor-এর অ্যালগরিদমকোয়ান্টাম কম্পিউটারে বড় সংখ্যা দ্রুত গুণনীয়করণ করে RSA-জাতীয় এনক্রিপশন ভাঙার তাত্ত্বিক পদ্ধতি দিয়ে বহু আগেই গাণিতিকভাবে প্রমাণিত। সেই বিপদের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের NIST ২০২৪ সালের আগস্টে চূড়ান্ত করে প্রথম তিনটি পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি (PQC)পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি (PQC)ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম কম্পিউটারের আক্রমণ প্রতিরোধী নতুন প্রজন্মের এনক্রিপশন মান মান — ML-KEM, ML-DSA এবং SLH-DSA।

সরকার, ব্যাংক ও বড় ক্লাউড প্রোভাইডারদের এখন থেকেই এই অ্যালগরিদমে স্থানান্তরের কাজ শুরু করা উচিত, আর কেন এত তাড়া — তার কারণটা আতঙ্কজনক। আক্রমণকারীরা আজকের এনক্রিপ্টেড ডেটা সংগ্রহ করে রেখে দিচ্ছে, ভবিষ্যতে কোয়ান্টাম দিয়ে সেটা পড়ার কৌশল নিয়ে — যাকে বলা হয় “harvest now, decrypt later”“harvest now, decrypt later”আজ ভাঙা না গেলেও এনক্রিপ্টেড ডেটা সংগ্রহ করে রাখা, যাতে ভবিষ্যতে শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার দিয়ে তা পড়া যায়। অর্থাৎ আজ যে ডেটা নিরাপদ মনে হচ্ছে, দশ বছর পর সেটাই ফাঁস হয়ে যেতে পারে, আর ততদিনে পাল্টানোর কিছু থাকবে না।

বাংলাদেশ কি এই দৌড়ে পিছিয়ে পড়ছে?

সরাসরি কোয়ান্টাম হার্ডওয়্যারের অ্যাক্সেস আমাদের দেশে এখনো সীমিত, এটা মানতেই হবে। তবে আশার কথা, একাডেমিক আগ্রহ বাড়ছে — বুয়েট (BUET) ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় (NSU) ইতিমধ্যে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং সংক্রান্ত কোর্স চালু করেছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা IBM Qiskit ও ক্লাউড-ভিত্তিক সিমুলেটর ব্যবহার করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। এটা ভালো শুরু, কিন্তু যথেষ্ট নয়।

আমার কাছে সবচেয়ে বড় বাস্তব উদ্বেগ কোয়ান্টাম হার্ডওয়্যার নয়, বরং ক্রিপ্টোগ্রাফিক মাইগ্রেশন। বাংলাদেশ ব্যাংক, NID ডেটাবেজ, ই-পাসপোর্ট সিস্টেম এবং ডিজিটাল সেবাগুলোর অবকাঠামোতে ব্যবহৃত এনক্রিপশন ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম আক্রমণের মুখে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়তে পারে। আর এই স্থানান্তর রাতারাতি হয় না — তাই নীতি-পর্যায়ে এখন থেকেই PQC মানে স্থানান্তরের পরিকল্পনা শুরু করা জরুরি, দশ বছর পরে নয়।

Condor মানে গন্তব্য নয়, গন্তব্যের পথে একটা বড় মাইলফলক মাত্র। হাজার কিউবিট পার হওয়া যেমন প্রযুক্তিগত অর্জন, তেমনই এটা একটা বার্তাও দেয় — কোয়ান্টাম যুগ এখন আর কল্পবিজ্ঞান নয়, এটা একটা প্রস্তুতির প্রশ্ন। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ যদি সময়মতো দক্ষ জনবল ও নিরাপদ অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারে, তাহলে পরবর্তী দশকের এই রূপান্তরে আমরাও অংশ নিতে পারব — শর্ত একটাই, প্রস্তুতিটা শুরু করতে হবে আজই, কাল নয়।