ধরুন তিন বছর আগে আপনি নিয়মিত টুইটার ব্যবহার করতেন — সকালে চোখ খুলে টাইমলাইন স্ক্রল করাটা ছিল অভ্যাস। আজ যদি সেই প্ল্যাটফর্মে ফিরে যান, নাম বদলেছে, লোগো বদলেছে, এমনকি অ্যালগরিদমের ‘সুর’-ও বদলে গেছে বলে মনে হবে। প্রশ্নটা হলো — এই তিন বছরে ঠিক কী ঘটল, আর সেটা কি স্রেফ একটা কোম্পানি অধিগ্রহণের গল্প, নাকি পুরো সোশ্যাল মিডিয়া দুনিয়ার এক নীরব বিপ্লবের সূচনা?

২০২২ সালের ২৭ অক্টোবর, দীর্ঘ আইনি টানাপোড়েনের পর বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তি ইলন মাস্ক ৪,৪০০ কোটি ডলারে টুইটার অধিগ্রহণ সম্পন্ন করেন। সান ফ্রান্সিসকোর সদর দপ্তরে ঢোকার সময় হাতে সিঙ্ক (sink) নিয়ে তৈরি তাঁর ভিডিওটা তখন নিছক মজার মনে হয়েছিল অনেকের কাছে — কিন্তু পেছন ফিরে তাকালে সেটাকেই এখন মনে হয় প্রতীকী: একটা প্রতিষ্ঠিত প্ল্যাটফর্মকে ভেঙে-গড়ে নতুন করে বানানোর ঘোষণা। অধিগ্রহণের এক সপ্তাহের মধ্যেই মাস্ক টুইটারের প্রায় অর্ধেক কর্মীকে ছাঁটাই করেন, আর ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে কর্মীসংখ্যা নেমে আসে আগের প্রায় ৭,৫০০ থেকে ১,৫০০-তে — অর্থাৎ ৮০ শতাংশের বেশি কমে গিয়েছিল। ২০২৩ সালের ২৩ জুলাই বিশ্ববিখ্যাত নীল পাখির লোগো সরিয়ে প্ল্যাটফর্মের নাম বদলে রাখা হয় “এক্স” (X)। আমার কাছে এই নাম বদলটা নিছক রিব্র্যান্ডিং ছিল না — এটা ছিল অতীতের সব দায় ঝেড়ে ফেলার একটা প্রতীকী চেষ্টা।

বিজ্ঞাপনদাতারা কেন পালাল, আর মাস্ক কেন থামলেন না?

কনটেন্ট মডারেশনেরকনটেন্ট মডারেশনেরপ্ল্যাটফর্মে আপত্তিকর, ক্ষতিকর বা নিয়মভঙ্গকারী কনটেন্ট পর্যবেক্ষণ ও অপসারণের নীতি ও প্রক্রিয়া নীতিমালা শিথিল হওয়ায় ২০২২ সালের শেষ দিকে বিজ্ঞাপনদাতাদের মধ্যে আস্থা নড়বড়ে হতে শুরু করে। জেনারেল মোটরস, ফাইজার, আইবিএম, অ্যাপলসহ বড় ব্র্যান্ডগুলো একে একে বিজ্ঞাপন দেওয়া বন্ধ বা স্থগিত রাখে — আর যেকোনো প্ল্যাটফর্মের জন্যই এটা রেড অ্যালার্ট হওয়ার কথা। ২০২৩ সালের অক্টোবরে এক্স মিডিয়া ম্যাটার্সের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে, অভিযোগ করে যে ওই সংস্থার প্রতিবেদনের কারণেই বিজ্ঞাপনদাতারা পালিয়েছেন — যা আমার চোখে মূল সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরানোর একটা চেষ্টা মনে হয়েছে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর মুহূর্তটা এল ২০২৩ সালের নভেম্বরে, নিউ ইয়র্কে DealBook Summit-এ। আয়োজক অ্যান্ড্রু রস সরকিনের প্রশ্নের জবাবে মাস্ক সরাসরি পলায়নপর বিজ্ঞাপনদাতাদের উদ্দেশে অশোভন শব্দ ব্যবহার করলেন — সেই সপ্তাহের সবচেয়ে আলোচিত টেক-ঘটনা। একজন সিইও নিজের সবচেয়ে বড় গ্রাহকদের প্রকাশ্যে এভাবে আক্রমণ করছেন, এটা ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে বিরল, আর সেই মুহূর্তটা কোম্পানির সঙ্গে ব্র্যান্ডগুলোর সম্পর্কে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষত রেখে গেছে।

‘এভরিথিং অ্যাপ’ — স্বপ্ন নাকি এখনো শুধু স্লোগান?

বিজ্ঞাপনের বিকল্প আয়ের পথ হিসেবে ২০২২ সালের নভেম্বরে চালু হয় Twitter Blue (পরে Premium নামে পুনর্নামকরণ), যেখানে ৮ থেকে ১৬ ডলার মাসিক ফি-র বিনিময়ে নীল টিক চিহ্ন ও অতিরিক্ত ফিচার মেলে। ২০২৩ সালের জুন থেকে লিন্ডা ইয়াকারিনো কোম্পানির সিইও হিসেবে দায়িত্ব নেন, যাঁর মূল কাজ ছিল বিজ্ঞাপনদাতাদের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা — একটা কঠিন দায়িত্ব, কারণ যে ব্যক্তি আস্থা ভেঙেছেন তিনিই এখনো প্রকাশ্যে সবচেয়ে বেশি কথা বলেন।

এক্সের সাবস্ক্রিপশন-কেন্দ্রিক ব্যবসার পেছনে মাস্কের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট: “এভরিথিং অ্যাপ”“এভরিথিং অ্যাপ”মেসেজিং, পেমেন্ট, ভিডিও, চাকরি খোঁজার মতো একাধিক সেবাকে একটিমাত্র অ্যাপে একীভূত করার ধারণা তৈরি করা, যেখানে মেসেজিং, পেমেন্ট, ভিডিও, চাকরি খোঁজা — সবই এক জায়গায় চলবে। WeChat-এর মডেল থেকে অনুপ্রাণিত এই পরিকল্পনা শুনতে উচ্চাভিলাষী, কিন্তু বাস্তবে এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি — আর আমার মনে হয় না চীনের বাইরে এই মডেল সহজে কপি করা যায়, কারণ WeChat-এর সাফল্যের পেছনে একটা নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রক ও বাজার-বাস্তবতা কাজ করেছিল, যা পশ্চিমা বাজারে অনুপস্থিত।

বিশৃঙ্খলার সুযোগে কারা এগিয়ে এল?

এক্সের এই টালমাটাল অবস্থার সুযোগ নিয়ে কয়েকটা প্রতিদ্বন্দ্বী উঠে এসেছে, আর এটাই বোধহয় গোটা কাহিনির সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক:

  • Meta Threads — ২০২৩ সালের ৫ জুলাই চালু হয়ে মাত্র ৫ দিনে ১০ কোটি ব্যবহারকারী ছুঁয়ে ফেলে, যা প্রমাণ করে মানুষ বিকল্প খুঁজছিল, শুধু একটা ভালো দরজার অপেক্ষায় ছিল।
  • Bluesky — ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সর্বসাধারণের জন্য খোলা হয়; বছর শেষে ব্যবহারকারী প্রায় ২ কোটি।
  • Mastodon — বিকেন্দ্রীভূত ফেডিভার্সফেডিভার্সএকক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ ছাড়া পরস্পর-সংযুক্ত স্বাধীন সার্ভারের নেটওয়ার্কে চলা সামাজিক যোগাযোগ মডেল মডেলে ধীরে ধীরে স্থিতিশীল ব্যবহারকারী-ভিত্তি ধরে রাখছে, যদিও এটা কখনোই মূলধারার আকার নেয়নি।

প্ল্যাটফর্মের নিরপেক্ষতা বলে কি আসলেই কিছু থাকে?

২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচন চক্রে এক্স হয়ে ওঠে প্রধান রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি। মাস্ক নিজেই তাঁর প্রায় ২০ কোটি ফলোয়ারের সামনে নিয়মিত নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষকে সমর্থন দিয়ে বার্তা ছড়িয়েছেন — যা প্ল্যাটফর্মের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। সমালোচকদের মতে অ্যালগরিদমিক অ্যামপ্লিফিকেশনঅ্যালগরিদমিক অ্যামপ্লিফিকেশনঅ্যালগরিদম নির্দিষ্ট কনটেন্ট বা মতামতকে অন্যদের তুলনায় বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া বদলে গেছে মালিকের পছন্দের পক্ষে, আর সত্যি বলতে, এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা — একজন মালিক যখন প্ল্যাটফর্মের সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠও হয়ে ওঠেন, তখন ব্যবহারকারীর জন্য ‘নিরপেক্ষ জায়গা’ বলে কিছু আর থাকে না।

আমাদের দেশের ব্যবহারকারীদের জন্য এর মানে কী?

বাংলাদেশে টুইটার কখনোই ফেসবুকের মতো ব্যাপক ছিল না, এটা ঠিক। তবু সাংবাদিক, গবেষক, স্টার্টআপ উদ্যোক্তা ও ক্রিকেট-ভক্তদের একটা বড় অংশ এখনো এক্সেই নিয়মিত — এটাই আমাদের প্রেক্ষাপটে প্ল্যাটফর্মটার প্রকৃত মূল্য। Threads-এর জনপ্রিয়তা ঢাকায় দ্রুত বাড়ছে, বিশেষত ইন্সটাগ্রাম-ব্যবহারকারী তরুণদের মধ্যে, যেটা আমি নিজেও লক্ষ করেছি। কিন্তু উদ্বেগের জায়গাও আছে — ছাঁটাইয়ের পর বাংলায় কনটেন্ট মডারেশনের সক্ষমতা স্পষ্টতই দুর্বল হয়েছে; স্প্যাম, ভুয়া তথ্য ও অপব্যবহারের অভিযোগ বেড়েছে বলে স্থানীয় ডিজিটাল রাইটস সংগঠনগুলো মনে করে। আমাদের ব্যবহারকারীদের জন্য এর অর্থ পরিষ্কার — একটা প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরতা এখন আগের চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

তিন বছর আগে পৃথিবীর অন্যতম মূলধারার মাইক্রোব্লগিং প্ল্যাটফর্মমাইক্রোব্লগিং প্ল্যাটফর্মছোট, সংক্ষিপ্ত বার্তা প্রকাশ ও শেয়ারের জন্য তৈরি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে টুইটার যে অবস্থানে ছিল, আজকের এক্স সেটা ধরে রাখতে পেরেছে কি না — সেই বিতর্ক দীর্ঘদিন চলবে, আর আমি নিজেও নিশ্চিত উত্তর দিতে পারব না। তবে একটা বিষয়ে আমি নিশ্চিত: সোশ্যাল মিডিয়ার একচেটিয়া যুগ শেষ। এখন ব্যবহারকারীর সামনে একাধিক বিকল্প, প্রত্যেকটার নিজস্ব দর্শন ও ঝুঁকি — আর সেই পছন্দটা এখন থেকে আমাদের নিজেদেরই সচেতনভাবে করতে হবে।