ফ্রিজের আকারের একটি উপগ্রহ, ভেতরে চারটি এআই চিপ, আর পাশে সৌর প্যানেল। শুনতে ছোট মনে হলেও Google একে দেখছে অনেক বড় একটি প্রশ্নের প্রথম পরীক্ষা হিসেবে: এআই-এর ডেটা সেন্টার কি একদিন পৃথিবী ছেড়ে কক্ষপথে যেতে পারবে?

১ অক্টোবর SpaceX-এর Transporter-18 মিশনে Project Suncatcher-এর প্রোটোটাইপ উপগ্রহটি মহাকাশে গেছে। ক্যালিফোর্নিয়ার Vandenberg ঘাঁটি থেকে Falcon 9 রকেটে ১৩০টি পেলোডের সঙ্গে উড়েছে এটি। Google জানিয়েছে, উপগ্রহের সঙ্গে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং সেটি প্রত্যাশামতো চলছে। কিন্তু এই সাফল্যকে ডেটা সেন্টারের সূচনা ভাবলে ভুল হবে। এটি একটি পরীক্ষা, আর এই ধারণার বাধাগুলো সত্যিই বড়।

উপগ্রহটিতে আসলে কী আছে

Planet Labs-এর সঙ্গে তৈরি এই উপগ্রহের নাম MVP. The New York Times-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী এতে আছে Google-এর চারটি টেনসর প্রসেসিং ইউনিট বা টিপিইউ, যার ক্ষমতা একটি ডেটা সেন্টারের একটি সার্ভারের সমান। চিপগুলো সৌর প্যানেল থেকে পাবে প্রায় ১ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ। Google এই বিদ্যুতের হিসাব নিয়ে CNN-কে মন্তব্য করেনি। প্রতিবেদনটি বলছে, উপগ্রহটি এক বছর কাজ করবে, যদিও পৃথিবীকে ঘুরতে পারে ছয় বছর পর্যন্ত।

Google-এর ব্লগ অনুযায়ী আগামী কয়েক সপ্তাহে দল দেখবে, রকেট উৎক্ষেপণের ধাক্কা, বিকিরণ আর চরম তাপমাত্রা টিপিইউ কতটা সামলাতে পারে। আগামী বছর আরও দুটি উপগ্রহ পাঠানোর পরিকল্পনা আছে, যেগুলো লেজারে একে অন্যের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান পরীক্ষা করতে পারে। Google-এর ২০২৫ সালের গবেষণায় ৮১টি উপগ্রহের একটি গুচ্ছের নমুনা নকশা ছিল, যেগুলো প্রায় ৬৫০ কিলোমিটার উচ্চতায় এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে ঘনিষ্ঠভাবে উড়বে।

পরিকল্পনাটি আসলে আগেই এগিয়ে এসেছে। The New York Times জানিয়েছে, Planet Labs শুরুতে ২০২৭ সালে দুটি উপগ্রহ পাঠাতে রাজি হয়েছিল, কিন্তু Google এ বছরই কক্ষপথে যেতে চায় এবং তার জন্য ঝুঁকি নিতেও রাজি ছিল। তাই তারা Planet-এর একটি তৈরি উপগ্রহে নিজেদের চিপ বসিয়ে দেয়। Google ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই চিপগুলোর বিকিরণ পরীক্ষা শুরু করেছিল।

কেন কক্ষপথে ডেটা সেন্টার চায় কোম্পানিগুলো

মূল আকর্ষণ বিদ্যুৎ। Google-এর গবেষকদের মতে, সঠিক কক্ষপথে একটি সৌর প্যানেল পৃথিবীর চেয়ে সর্বোচ্চ আট গুণ বেশি উৎপাদনশীল হতে পারে, কারণ সেখানে প্রায় অবিরাম সূর্যালোক পাওয়া যায়, রাত বা মেঘের বাধা থাকে না।

দ্বিতীয় কারণ পৃথিবীর সীমাবদ্ধতা। CNN লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রামীণ এলাকায় ডেটা সেন্টারের বিরুদ্ধে স্থানীয় আন্দোলন জোরালো হচ্ছে। ডেটা সেন্টারের জন্য জমি, বিদ্যুৎ ও শীতলীকরণের পানি লাগে, আর এআই-এর চাহিদা এই তিনটির ওপরই চাপ বাড়াচ্ছে। মহাকাশে গেলে অন্তত স্থানীয় আপত্তিটা এড়ানো যায়।

Google একা নয়। SpaceX সর্বোচ্চ ১০ লাখ এআই কম্পিউটিং উপগ্রহের পরিকল্পনার কথা বলেছে। Blue Origin-ও নিয়ন্ত্রক অনুমোদন চেয়েছে। CNN মনে করিয়ে দিয়েছে, এআই চিপ মহাকাশে পাঠানোর কাজ এর আগেও হয়েছে। Google-এর পরীক্ষার বিশেষত্ব হলো, এখানে তাদের নিজস্ব টিপিইউ পরখ করা হচ্ছে।

আসল বাধাগুলো কোথায়

কাগজে হিসাব যত সুন্দর, মহাকাশে কাজ তত কঠিন।

তাপ বের করাই সবচেয়ে বড় সমস্যা

মহাকাশ ঠান্ডা, এই ধারণা বিভ্রান্তিকর। সেখানে বাতাস নেই, তাই পাখা বা পরিচলন দিয়ে তাপ সরানো যায় না। তাপ ছাড়তে হয় শুধু বিকিরণের মাধ্যমে, বড় রেডিয়েটর দিয়ে। IEEE Spectrum-এ ABI Research-এর বিশ্লেষক অ্যান্ড্রু ক্যাভালিয়ারের (Andrew Cavalier) হিসাবে, ৪০ কিলোওয়াটের একটি র‍্যাকের জন্য লাগতে পারে প্রায় ৮০ বর্গমিটার রেডিয়েটর। ১০০ মেগাওয়াটের কেন্দ্রের জন্য এমন অন্তত ২,৫০০টি।

এই পরীক্ষাও সমস্যাটি সমাধান করছে না। CNN-কে Google-এর মুখপাত্র বলেছেন, অতিরিক্ত গরম এড়াতে উপগ্রহটিকে প্রতি ২০ মিনিটে বন্ধ করতে হবে। The New York Times-কে প্রকল্পের কর্মকর্তা ট্র্যাভিস বিলস (Travis Beals) বলেছেন, চিপগুলো প্রায় ১৫ মিনিট চলার পর ঠান্ডা হওয়ার জন্য থামাতে হবে। মাত্র ১ কিলোওয়াটেই এই অবস্থা, অথচ Google-এর গবেষণাপত্র বলছে, কাজের উপগ্রহে পৃথিবীর একটি সাধারণ র‍্যাকের মতো ৫০ থেকে ১০০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ লাগতে পারে। Quilty Space-এর গবেষণা পরিচালক ক্যালেব হেনরি (Caleb Henry) CNN-কে জানান, এখনকার টেলিযোগাযোগ উপগ্রহ চলে প্রায় ১০ থেকে ২০ কিলোওয়াটে, আর এআই উপগ্রহের লাগতে পারে ১০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত। পরের দুটি উপগ্রহ অবশ্য একটানা চলতে পারবে বলে Google জানিয়েছে।

বিকিরণ

উচ্চশক্তির কণা চিপের তথ্য উল্টে দিতে পারে, যাকে বলে বিট ফ্লিপ, আর দীর্ঘমেয়াদে হার্ডওয়্যারের আয়ুও কমায়। Google ক্যালিফোর্নিয়ার UC Davis-এর একটি ল্যাবে টিপিইউ পরীক্ষা করে উৎসাহব্যঞ্জক ফল পেয়েছে। পাঁচ বছরের মিশনের সমান মাত্রার বিকিরণ চিপগুলো সহ্য করেছে। তবু কোম্পানি নিজেই বলছে, কিছু বিষয় কেবল মহাকাশেই পরীক্ষা করা সম্ভব।

খরচ

Google-এর ধারণা, ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি প্রতি কেজি উৎক্ষেপণ খরচ ২০০ ডলারের নিচে নামলে মহাকাশের ব্যয় পৃথিবীর জ্বালানি খরচের কাছাকাছি আসতে পারে। এটি বড় একটি শর্ত। CNN বলছে, উৎক্ষেপণ খরচ এখন কমছে না, বরং বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি। ক্যাভালিয়ারের মোটা দাগের হিসাবে আশাবাদী অনুমান ধরলেও মহাকাশে একটি জিপিইউ এক বছর চালানোর খরচ স্থলভাগের ডেটা সেন্টারের অন্তত দশ গুণ। এটি একজন বিশ্লেষকের মডেল, চূড়ান্ত সত্য নয়, তবে সন্দেহের জায়গাটা স্পষ্ট করে।

উপগ্রহে উপগ্রহে তথ্য চলাচল

একটি উপগ্রহে বড় এআই মডেল চালানো যাবে না, অনেকগুলোকে একসঙ্গে একটি কম্পিউটারের মতো কাজ করতে হবে। Google-এর হিসাবে এর জন্য উপগ্রহগুলোর মধ্যে সেকেন্ডে কয়েক দশ টেরাবিট গতির সংযোগ দরকার। পরীক্ষাগারে তারা এক জোড়া ট্রান্সসিভারে প্রতি দিকে ৮০০ গিগাবিট/সেকেন্ড পেয়েছে। এই গতির জন্য উপগ্রহগুলোকে খুব কাছাকাছি উড়তে হবে, নকশা অনুযায়ী পাশের উপগ্রহের দূরত্ব কয়েকশ মিটার। CNN বলছে, লেজারের মাধ্যমে উপগ্রহের মধ্যে যোগাযোগ এখনো নবীন প্রযুক্তি, আর বড় পরিসরে তা দেখিয়েছে মূলত Starlink.

পুরোনো হয়ে যাওয়া ও ভিড়

JLL Research-এর একটি প্রতিবেদন CNN-এ উদ্ধৃত হয়েছে: এআই চিপ এক থেকে দুই বছরে এগিয়ে যায়, অথচ উপগ্রহ টেকে পাঁচ থেকে সাত বছর। ডেটা সেন্টারে পুরোনো চিপ খুলে নতুন বসানো যায়, কক্ষপথে তা সহজ নয়। এদিকে উপগ্রহের ভিড়ে সংঘর্ষের ঝুঁকিও বাড়ছে, আর হাজার হাজার নতুন কম্পিউটিং উপগ্রহ সেই উদ্বেগ বাড়াতে পারে।

বাংলাদেশের দিক থেকে

কক্ষপথের ডেটা সেন্টার বাংলাদেশের সামনের দিনের সমস্যার সমাধান নয়। Google-এর গবেষণা প্রধান জেমস মানিকা (James Manyika) The New York Times-কে বলেছেন, আগামী কয়েক বছরে কার্যকর কিছু তাঁরা আশা করছেন না।

তবে প্রশ্নটি আমাদের জন্য একেবারে দূরের নয়। The Financial Express-এর আগস্টের একটি লেখায় দেখা যায়, যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ২০০ কোটি ডলারের এআই ডেটা সেন্টারের প্রস্তাব দিয়েছে। সেই লেখাতেই প্রশ্ন তোলা হয়েছে, এত বিদ্যুৎ কোথা থেকে আসবে, আর শীতলীকরণের পানির চাপ কে সামলাবে। অর্থাৎ যে সীমাবদ্ধতা Google-কে মহাকাশের দিকে ঠেলছে, সেটি বাংলাদেশে আরও কঠিন রূপে আছে।

আমাদের মতে, বাংলাদেশের জন্য বাস্তব পথ এখনো পৃথিবীতেই: দক্ষ শীতলীকরণ, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আকারের স্থানীয় ডেটা সেন্টার। পাশাপাশি একটি নীতিগত প্রশ্নও ভাবার মতো। কোনো দেশের তথ্য যদি একদিন বিদেশি কোম্পানির উপগ্রহে প্রক্রিয়া হয়, তখন কোন দেশের আইন খাটবে? এর স্পষ্ট উত্তর এখনো তৈরি হয়নি।

এই পরীক্ষা থেকে কী আশা করবেন

Google নিজেই এই কাজকে স্বচালিত গাড়ি বা কোয়ান্টাম গবেষণার মতো দীর্ঘ যাত্রার সঙ্গে তুলনা করছে। তাই আগামী কয়েক সপ্তাহে যে ফলই আসুক, সেটিকে এক ধাপের তথ্য হিসেবে দেখুন। ব্যর্থতা মানে ধারণাটি শেষ নয়, সাফল্য মানেও ডেটা সেন্টার তৈরি নয়। আপনি যদি ক্লাউড বা অবকাঠামো নিয়ে শিখছেন, এই খবরের সবচেয়ে কাজের শিক্ষা হলো: এআই-এর ভবিষ্যৎ শুধু মডেলের নয়, বিদ্যুৎ, তাপ আর খরচের হিসাবেরও।

সূত্র