২০২১ সালে যদি আপনি কোনো সাস স্টার্টআপ ফাউন্ডার হতেন, তাহলে "গ্রোথ অ্যাট অল কস্টস" মন্ত্রেই বিনিয়োগকারীরা আপনাকে অর্থ ঢেলে দিত — লাভের প্রশ্ন তখন গৌণ ছিল। আজ সেই একই ফাউন্ডারকে বসতে হচ্ছে সম্পূর্ণ উল্টো এক টেবিলে। ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল ছিল সাস (Software-as-a-Service) স্টার্টআপের স্বর্ণযুগ — রেকর্ডস্তরের ভেঞ্চার পুঁজি, আকাশচুম্বী মূল্যায়ন। কিন্তু ২০২৩ সালের মাঝামাঝি থেকে সেই ছবিটা সম্পূর্ণ ঘুরে গেছে, আর আমার মতে, এই বদলটা সাময়িক নয় — এটা একটা কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস।
উচ্চ সুদহার, আইপিও-বাজারের স্থবিরতা এবং এন্টারপ্রাইজ ক্রেতাদের টুল-ফ্যাটিগটুল-ফ্যাটিগপ্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত সংখ্যক সফটওয়্যার টুল ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট ক্লান্তি ও ব্যবস্থাপনা জটিলতা — এই তিনটে মিলে বিশ্ব সাস বাজারকে ঠেলে দিয়েছে ক্রেতা-চালিত কনসোলিডেশনকনসোলিডেশনএকই খাতের অনেক ছোট প্রতিষ্ঠান মিশে বা অধিগৃহীত হয়ে কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া পর্বে। ২০২৪ সালে গার্টনারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ব পাবলিক ক্লাউড সার্ভিসেসের বাজার প্রায় ৬৭,৫০০ কোটি ডলার হলেও সাস সেগমেন্টের বৃদ্ধির হার ২৫ শতাংশের উপর থেকে নেমে এসেছে আনুমানিক ১৭ শতাংশে। কারণটা গভীরে — গড়পড়তা এন্টারপ্রাইজ একসময় ১০০-র বেশি সাস টুল ব্যবহার করত, আর এখন তারা বুঝে গেছে এত টুলের দরকার নেই, তারা সেগুলো কমিয়ে এক-ছাতার প্ল্যাটফর্মে সুইচ করছে।
বড় মাছ ছোট মাছ গিলছে — এটা কি স্বাস্থ্যকর?
প্রাইভেট ইকুইটি ও বড় এন্টারপ্রাইজরা সুযোগ বুঝে ২০২৩-২৪ সালে বড় বড় সাস কোম্পানি কিনে নিয়েছে:
- Thoma Bravo — Darktrace (২০২৪, ৫৩০ কোটি ডলার), Everbridge, Coupa।
- Vista Equity — EngageSmart (৪০০ কোটি ডলার), Model N।
- IBM — HashiCorp (৬৪০ কোটি ডলার, ঘোষণা এপ্রিল ২০২৪)।
- Cisco — Splunk (২,৮০০ কোটি ডলার, বন্ধ হয় মার্চ ২০২৪)।
এই তরঙ্গটা আমার কাছে স্পষ্ট একটা বার্তা বহন করে — ছোট, স্বতন্ত্র সাস সরঞ্জামের দিন ফুরিয়ে আসছে। বড় প্ল্যাটফর্মের ছাতার নিচে যাওয়াটাই এখন ব্যতিক্রম নয়, নিয়ম।
"Rule of 40" — বিনিয়োগকারীরা হঠাৎ লাভ নিয়ে এত সিরিয়াস কেন?
বিনিয়োগকারীদের নতুন মাপকাঠির নাম "Rule of 40Rule of 40সাস কোম্পানির রাজস্ব বৃদ্ধির হার ও মুনাফার মার্জিন যোগ করে অন্তত চল্লিশ হওয়া উচিত এমন বিনিয়োগ মাপকাঠি": কোম্পানির বার্ষিক রাজস্ব বৃদ্ধির হার আর মুনাফার মার্জিন যোগ করলে সেই যোগফল ৪০-এর বেশি হওয়া উচিত। ২০২১ সালে যেসব কোম্পানি শুধু বৃদ্ধির ভিত্তিতে ১০০ গুণ ARRARRAnnual Recurring Revenue — সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক কোম্পানির বার্ষিক পুনরাবৃত্ত রাজস্ব-এ মূল্যায়িত হতো, তারা এখন মুনাফার পথ দেখাতে না পারলে মূল্যায়ন নাটকীয়ভাবে কমে যাচ্ছে। এটাই আমার চোখে সবচেয়ে বড় মানসিকতার বদল — বৃদ্ধি একা আর যথেষ্ট গল্প নয়। এই কারণেই Salesforce, HubSpot, Zendesk, Workday-র মতো বড় প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোও ২০২৩-২৪ সালে ছাঁটাই করেছে। যদি এই জায়ান্টরা রেহাই না পায়, তাহলে ছোট স্টার্টআপের জন্য বার্তাটা আরও কঠোর।
আইপিও-র দরজা বন্ধ থাকলে ফাউন্ডাররা কোথায় যাবেন?
২০২২ থেকে ২০২৪-এর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত সাস কোম্পানিগুলোর জন্য আইপিও-র দরজা প্রায় বন্ধই ছিল। ব্যতিক্রম হিসেবে Klaviyo (সেপ্টেম্বর ২০২৩), Rubrik (এপ্রিল ২০২৪) ও Reddit (মার্চ ২০২৪) বাজারে এসেছে ঠিকই, কিন্তু আগের চেয়ে অনেক সংযত মূল্যায়নে — যেন বাজার নিজেই সতর্কবার্তা দিচ্ছে। Stripe, Klarna, Canva-র মতো বড় প্রাইভেট সাস কোম্পানি নিজেদের আইপিও পরিকল্পনা একাধিকবার পিছিয়েছে, আর এই ইতস্তত ভাবটাই বলে দেয় বাজার এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ায়নি।
ফাউন্ডারদের জন্য নতুন নিয়ম কী?
"Burn rateBurn rateকোম্পানি প্রতি মাসে যে হারে তার নগদ তহবিল খরচ করছে" চালিয়ে যাওয়ার বিলাসিতা এখন আর নেই। সিড থেকে সিরিজ এ-তে যাওয়ার জন্য এখন দাবি — বাস্তব রাজস্ব, প্রমাণিত ইউনিট ইকোনমিকসইউনিট ইকোনমিকসপ্রতি গ্রাহক বা প্রতি একক পণ্য থেকে আয় ও খরচের হিসাব যা ব্যবসার লাভজনকতা বোঝায়, কম চার্নচার্ননির্দিষ্ট সময়ে যত গ্রাহক সেবা ব্যবহার বন্ধ করে দেয় তার হার এবং লাভজনকতার স্পষ্ট পথ। আমার কাছে এই পরিবর্তনটা আদতে স্বাস্থ্যকর — অনেক ফাউন্ডার এখন ভেঞ্চার পুঁজির বদলে বুটস্ট্র্যাপিং বা রেভিনিউ-ফাইন্যান্সিংয়ের দিকে ঝুঁকছেন, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদে নিজের কোম্পানির উপর বেশি নিয়ন্ত্রণ দেয়।
বাংলাদেশের স্টার্টআপরা কি এই ধাক্কা এড়াতে পারবে?
উত্তরটা হলো, না — বাংলাদেশের সাস ও টেক স্টার্টআপ, ShopUp, Pathao, Truck Lagbe, Bondstein, BuildMyCV, একই ধাক্কার মুখোমুখি। আমাদের এখানে ভেঞ্চার পুঁজির প্রবাহ কমেছে, বিনিয়োগকারীরা এখন দ্রুত লাভজনকতার পথ দেখতে চান, মূল্যায়ন কমেছে। ShopUp ২০২৩-২৪ সালে একাধিক রাউন্ডে আলোচনা করে, খরচ কমিয়ে ও ছাঁটাই করে টিকে থাকার চেষ্টা করেছে। এই পরিবেশে স্থানীয় ফাউন্ডারদের জন্য আমার বার্তা স্পষ্ট — বাস্তব পণ্যের বাজার-সাফল্য ও স্থিতিশীল ইউনিট ইকোনমিকসের উপর ফোকাস করতেই হবে, আর কোনো বিকল্প নেই।
তবে সব দিক নেতিবাচক নয়, এটাও বলা দরকার। এই কনসোলিডেশন পর্বে যাঁরা টিকে থাকবেন, তাঁদের জন্য বাজারে কম প্রতিযোগী থাকবে, ভালো প্রতিভা সাশ্রয়ী দামে পাওয়া যাবে, আর পরবর্তী বুল সাইকেলে নেতৃত্বের জায়গা দখল করার সুযোগ থাকবে। ইতিহাস আমাদের এটাই শেখায় — প্রতিটা মন্দার ভেতর থেকেই পরের প্রজন্মের বিজয়ী প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে ওঠে। প্রশ্নটা হলো, বাংলাদেশের কোন স্টার্টআপগুলো এই কঠিন সময়টাকে নিজেদের ভিত্তি মজবুত করার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করবে, আর কোনগুলো শুধু টিকে থাকার লড়াইয়েই হারিয়ে যাবে।