ধরুন একটা রকেট আকাশে ওঠার চার মিনিটের মাথায় নিজেকেই উড়িয়ে দিচ্ছে, আর প্রকৌশলীরা হতাশ না হয়ে হাততালি দিচ্ছেন। অদ্ভুত শোনাচ্ছে? অথচ ঠিক এটাই ঘটেছিল ২০২৩ সালের ২০ এপ্রিল, টেক্সাসের বোকা চিকায়। স্পেসএক্সের স্টারশিপ (Starship) — ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী রকেট — ৩৩টি Raptor ইঞ্জিন নিয়ে প্রথমবার আকাশে ওঠে, আর প্রায় চার মিনিট পর ৩৯ কিলোমিটার উচ্চতায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিজেকে উড়িয়ে দেয় (commanded self-destructcommanded self-destructনিরাপত্তার জন্য রকেট নিয়ন্ত্রণ হারালে মাটি থেকে সংকেত পাঠিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংস করে দেওয়া ব্যবস্থা)। বেশিরভাগ মানুষ একে বিশাল ব্যর্থতা বলে ধরে নিয়েছিল। আমি বলব, এখানেই সবচেয়ে বড় ভুল বোঝাবুঝি — স্পেসএক্সের কাছে এই বিস্ফোরণ ব্যর্থতা নয়, বরং একটা দামি ডেটাসেট।
আর প্রশ্নটা হলো — এই কোম্পানি একটা বিস্ফোরণ থেকে মাত্র আড়াই বছরে ঠিক কোথায় পৌঁছাল? উত্তরটা এমন এক দৃশ্য, যা কয়েক বছর আগেও কল্পবিজ্ঞান মনে হতো — আকাশ থেকে ফিরে আসা একটা রকেট বুস্টারকে মাঝ-আকাশেই একটা টাওয়ারের দুটি যান্ত্রিক বাহু দিয়ে ধরে ফেলা।
ব্যর্থতাকে যখন তথ্য হিসেবে দেখা হয়
২০২৩ সালের ১৮ নভেম্বর IFTIFTIntegrated Flight Test — স্টারশিপের প্রতিটি পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ ফ্লাইটের সরকারি নাম-2-তে প্রথমবার সফল হয় “hot staginghot stagingদ্বিতীয় ধাপের ইঞ্জিন চালু থাকা অবস্থাতেই প্রথম ধাপ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কৌশল” — দ্বিতীয় ধাপের ইঞ্জিন জ্বলে ওঠা অবস্থাতেই প্রথম ধাপ থেকে বিচ্ছেদ। সব ৩৩টি Raptor ইঞ্জিন ঠিকঠাক জ্বলল বটে, কিন্তু দ্বিতীয় ধাপ ১৪৯ কিলোমিটার উচ্চতায় গিয়ে ভেঙে পড়ল। আবার ব্যর্থতা? আমার চোখে বরং অগ্রগতি — গত বার যেখানে থেমেছিল, তার চেয়ে অনেক দূর।
২০২৪ সালের ১৪ মার্চ IFT-3 প্রথমবারের মতো কক্ষপথের গতিকক্ষপথের গতিপৃথিবীর চারপাশে স্থিতিশীল কক্ষপথে থাকতে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম গতি ছুঁয়ে ফেলে, পুনঃপ্রবেশেরও (reentry)পুনঃপ্রবেশেরও (reentry)মহাকাশযান বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসার প্রক্রিয়া চেষ্টা করে — যদিও অবতরণের সময় হারিয়ে যায়। তারপর জুনে IFT-4 আরও একধাপ এগোয়: Super Heavy বুস্টার নরমভাবে মেক্সিকো উপসাগরে নামে, উপরের Ship ধাপ সফট-ল্যান্ড করে ভারত মহাসাগরে। প্রতিটা ফ্লাইট আসলে আগেরটার ভুল শুধরে নেওয়ার একটা ধাপ ছিল — আর এই ধারাবাহিকতাই স্পেসএক্সের আসল শক্তি, শুধু একবারের নিখুঁততা নয়।
যে মুহূর্তে মহাকাশ শিল্পের নিয়ম বদলে গেল
২০২৪ সালের ১৩ অক্টোবর, IFT-5 ফ্লাইটে ঘটে সেই অভূতপূর্ব ঘটনা। উৎক্ষেপণের সাত মিনিট পর প্রায় ৭০ মিটার উঁচু Super Heavy বুস্টার নিজেই ফিরে আসে বোকা চিকা পাড়ের “Mechazilla” টাওয়ারের কাছে, আর টাওয়ারের দুটি যান্ত্রিক বাহু (chopsticks) সেটিকে মধ্য-আকাশেই ধরে ফেলে — তাও প্রথম চেষ্টাতেই। প্রকৌশলীদের সেই উল্লাসের ভিডিও যখন ভাইরাল হলো, আমার কাছে মনে হয়েছিল — এটা শুধু একটা প্রকৌশল কৃতিত্ব নয়, এটা প্রমাণ যে রকেট বিজ্ঞান আর শুধু "উৎক্ষেপণ করে হারিয়ে ফেলা" শিল্প থাকবে না।
তবে গল্পটা এখনো মসৃণ নয়। ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর IFT-6-এ দ্বিতীয় ক্যাচ চেষ্টা বাতিল করে বুস্টারকে নিরাপদে সমুদ্রে নামানো হয়, আর ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি IFT-7-এ দ্বিতীয় ধাপ উড্ডয়নকালেই ভেঙে পড়ে — যার ধ্বংসাবশেষ দেখা যায় টার্কস অ্যান্ড কাইকোসের আকাশে। এটাই মনে করিয়ে দেয়, একটা ঐতিহাসিক ক্যাচ মানেই যাত্রা শেষ নয়।
আসল লক্ষ্যটা কী — শুধু বড় রকেট, নাকি অর্থনীতি বদলে দেওয়া?
আমার মতে স্টারশিপকে বোঝার আসল চাবিকাঠি হলো এর লক্ষ্য — পূর্ণ পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা (full reusability)পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা (full reusability)রকেটের অংশ ধ্বংস না করে বারবার ব্যবহার করার সক্ষমতা। আজকের Falcon 9-এর প্রথম ধাপ পুনরায় ব্যবহার করা যায়, কিন্তু দ্বিতীয় ধাপ নয় — প্রতিবার সেটা পুড়ে যায় বা সমুদ্রে হারিয়ে যায়। স্টারশিপে দুই ধাপই ফিরে আসবে, দ্রুত জ্বালানি ভরে আবার উড়বে — অনেকটা বিমানের মতো। এতে উৎক্ষেপণের প্রতি কেজি খরচ আজকের তুলনায় অন্তত দশ গুণ কমে যেতে পারে। আর এই একটা সংখ্যাই বদলে দিতে পারে গোটা মহাকাশ অর্থনীতিকে।
- NASA Artemis III: স্টারশিপকে মানুষের চাঁদে অবতরণের যান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে; মিশন ২০২৬–২০২৭-এর আগে নয়।
- স্টারলিংক v3: পরবর্তী প্রজন্মের বড় স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মূল বাহন হবে স্টারশিপ।
- মঙ্গল মিশন: ২০২০-এর দশকের শেষে মঙ্গলে কার্গো মিশন পাঠানোর লক্ষ্য।
বাংলাদেশের জন্য এই গল্পটা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এখানেই আমি থামতে চাই এবং সরাসরি প্রশ্ন করতে চাই — এই আমেরিকান রকেট বিজ্ঞানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কী? উত্তরটা অনেকের অজানা, অথচ কাছের। ২০১৮ সালের ১১ মে বাংলাদেশের প্রথম যোগাযোগ স্যাটেলাইট “বঙ্গবন্ধু-১” উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল এই স্পেসএক্সেরই Falcon 9 রকেট দিয়ে, ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল থেকে। আমরা তখনই একবার এই কোম্পানির গ্রাহক হয়ে গিয়েছিলাম, হয়তো অনেকেই খেয়াল করিনি।
আমি মনে করি, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ যখন বঙ্গবন্ধু-২ বা কোনো আর্থ-অবজারভেশন স্যাটেলাইট পাঠানোর পরিকল্পনা করবে, তখন স্টারশিপের কল্যাণে উৎক্ষেপণ ব্যয় অনেক কম হওয়ার সম্ভাবনা আছে — আর এটা শুধু আমাদের সরকারের জন্য সুখবর নয়। সস্তা উৎক্ষেপণ মানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্যও দরজা খুলে যাওয়া। BRAC বিশ্ববিদ্যালয়ের BRAC Onnesha CubeSat-এর মতো ছাত্র-প্রকল্প এখন যতটা ব্যতিক্রম, ভবিষ্যতে ততটাই স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে উঠতে পারে।
স্টারশিপের প্রথম বিস্ফোরণ যাদের কাছে ব্যর্থতা মনে হয়েছিল, তাদের জন্য আড়াই বছরের মাথায় এই ‘rocket catch’ একটা কড়া জবাব। কিন্তু আমার কাছে আসল শিক্ষাটা প্রকৌশলগত নয়, মানসিকতাগত — বারবার ভেঙে পড়ে, ভেঙে পড়েই এগিয়ে যাওয়ার সাহস। মহাকাশে পৌঁছানো এখন আর শুধু পরাশক্তিদের বিলাসিতা নয়; এটা ধীরে ধীরে একটা পুনর্ব্যবহারযোগ্য, বারবার করা যায় এমন শিল্পে রূপ নিচ্ছে। আর বাংলাদেশের মতো একটা উন্নয়নশীল দেশের জন্য, আমার বিশ্বাস, এটাই সবচেয়ে বড় সুযোগের দরজা — শুধু দেখার নয়, ঢোকারও।