ধরুন আজ থেকে ঠিক তিন বছর আগে আপনি অফিসে বসে কাজ করছিলেন, আর হঠাৎ একজন সহকর্মী এসে বললেন, "একটা জিনিস দেখুন, এটা প্রায় মানুষের মতো লেখে।" ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর, সেই সন্ধ্যায় সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক ওপেনএআই (OpenAI) নীরবে একটি "রিসার্চ প্রিভিউ" উন্মুক্ত করেছিল — নাম চ্যাটজিপিটি (ChatGPT)। প্রতিষ্ঠানটির সিইও স্যাম অল্টম্যান তখন টুইটারে লিখেছিলেন, "চ্যাটজিপিটি চালু হলো। সবাই বিনামূল্যে ব্যবহার করতে পারবেন।" আমার মতো অনেকেই প্রথমে ভেবেছিলেন, এটা আরেকটা চ্যাটবট এক্সপেরিমেন্ট, কিছুদিন পরে হারিয়ে যাবে। সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হতে বেশি সময় লাগেনি।

মাত্র পাঁচ দিনে ব্যবহারকারীসংখ্যা ছাড়িয়ে যায় দশ লক্ষ। দুই মাসে সংখ্যাটি দশ কোটি — ইতিহাসের দ্রুততম বেড়ে ওঠা কনজিউমার অ্যাপ্লিকেশন। তুলনা করলেই বোঝা যায় এই গতি কতটা অস্বাভাবিক ছিল: টিকটকের একই মাইলফলক ছুঁতে লেগেছিল প্রায় নয় মাস, ইনস্টাগ্রামের আড়াই বছর। প্রশ্নটা তখনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল — এটা কোনো সাময়িক ট্রেন্ড নয়, একটা টেকটোনিক শিফট।

বিগ টেক কেন এত তাড়াহুড়ো করল?

চ্যাটজিপিটির উত্থান দেখে মাইক্রোসফট, গুগল আর মেটা যেভাবে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছিল, তাতেই বোঝা যায় তারা কতটা ভয় পেয়েছিল পিছিয়ে পড়ার। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে মাইক্রোসফট ওপেনএআইয়ে নতুন করে ১,০০০ কোটি ডলার ঢেলে দেয় এবং ফেব্রুয়ারিতেই Bing সার্চ ইঞ্জিনে জিপিটি-৪ ভিত্তিক চ্যাট সুবিধা বসিয়ে দেয়। গুগলও বসে থাকতে পারেনি — জবাবে আনে তাদের Bard (পরে যা Gemini নামে পরিচিত হয়)। মার্চে ওপেনএআই বাজারে আনে GPT-4, সেই সময়ের সবচেয়ে সক্ষম ভাষা মডেল।

মেটা অবশ্য অন্য পথ বেছে নেয় — বন্ধ মডেলের বদলে উন্মুক্ত মডেল। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তারা প্রথম LLaMA প্রকাশ করে, জুলাইয়ে আসে LLaMA 2, এবার বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতিসহ। এই সিদ্ধান্তটাই পরে গবেষক, স্টার্টআপ ও ছোট প্রতিষ্ঠানের জন্য দরজা খুলে দিয়েছিল — যারা এতদিন বড় ভাষা মডেল চালানোর সুযোগই পাননি, তারা এখন নিজের কম্পিউটারেই সেটা করতে পারছেন।

বিনামূল্যের চমক কীভাবে হাজার কোটি ডলারের ব্যবসা হয়ে উঠল?

বিনামূল্যে শুরু হলেও চ্যাটজিপিটি বেশিদিন বিনামূল্যে থাকেনি — থাকারও কথা ছিল না। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওপেনএআই মাসিক ২০ ডলারের "ChatGPT Plus" চালু করে, নভেম্বরে আনে "GPTs" — ব্যবহারকারীর নিজের তৈরি বিশেষ-উদ্দেশ্যের চ্যাটবট। কিন্তু আসল টাকা এসেছে এপিআইএপিআইভিন্ন ভিন্ন সফটওয়্যার একে অপরের সাথে যোগাযোগ করার জন্য ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস ব্যবসা থেকে। Duolingo, Stripe, Khan Academy, Salesforce-সহ হাজারো প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্যে জিপিটি মডেল যুক্ত করেছে, আর এই দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিগুলোই ওপেনএআইকে টিকিয়ে রেখেছে।

সংখ্যাটা দেখলেই বোঝা যায় ব্যাপারটা কতটা বড়: ২০২৫ সালের মাঝামাঝি ওপেনএআইয়ের বার্ষিক রাজস্ব দাঁড়িয়েছে আনুমানিক এক হাজার কোটি ডলারের কাছাকাছি, কোম্পানির মূল্যায়ন ছাড়িয়ে গেছে ১৫,০০০ কোটি ডলার। তিন বছর আগে যে সংখ্যাগুলো অকল্পনীয় মনে হতো, আজ সেগুলোই বাস্তবতা।

আমাদের ফ্রিল্যান্স বাজারে এর মানে কী?

বাংলাদেশের ছয় লক্ষাধিক ফ্রিল্যান্সারের কাছে চ্যাটজিপিটি একই সঙ্গে আশীর্বাদ এবং বিপদ সংকেত হয়ে এসেছে — আর এই দ্বিমুখী বাস্তবতাটা আমরা যত দ্রুত বুঝব, ততই ভালো। কনটেন্ট রাইটিং, অনুবাদ, সাধারণ কোডিং ও গ্রাফিক ব্রিফ তৈরির মতো এন্ট্রি-লেভেল কাজের দর Upwork ও Fiverr-এ হু হু করে পড়ে গেছে। কারণটা সহজ — যে কাজ একজন জুনিয়র ফ্রিল্যান্সার ঘণ্টার পর ঘণ্টা করতেন, এখন সেটা কয়েক মিনিটে করে দেয় চ্যাটজিপিটি। কিন্তু যারা এআই-সমৃদ্ধ সেবা দিতে শিখেছেন — প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিংপ্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিংএআই মডেল থেকে সঠিক ও কার্যকর উত্তর বের করার জন্য নিখুঁতভাবে নির্দেশ বা প্রশ্ন লেখার দক্ষতা, চ্যাটবট ইন্টিগ্রেশন, কাস্টম জিপিটি ডেভেলপমেন্ট — তাদের ঘণ্টাপ্রতি দর বেড়েছে কয়েক গুণ। ফারাকটা এখানেই: যারা এআইকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবেছেন, তারা পিছিয়ে পড়েছেন; যারা একে হাতিয়ার বানিয়েছেন, তারা এগিয়ে গেছেন।

বেসিস (BASIS)-এর ২০২৪ সালের এক জরিপ এই পরিবর্তনের গতি স্পষ্ট করে দেয়: দেশের প্রায় ৬৮ শতাংশ সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান এখন দৈনন্দিন কাজে কোনো-না-কোনো এআই টুল ব্যবহার করছে, যেখানে দুই বছর আগে এই হার ছিল মাত্র ৯ শতাংশ। এত দ্রুত এই পরিবর্তন হবে, সেটা আমি নিজেও দুই বছর আগে অনুমান করিনি।

এত সাফল্যের পরও কেন এত বিতর্ক?

জয়যাত্রা যতই চমকপ্রদ হোক, বিতর্ক তার পিছু ছাড়েনি — আর এই বিতর্কগুলো উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। ভাষা মডেলগুলোর "হ্যালুসিনেশনহ্যালুসিনেশনএআই মডেল আত্মবিশ্বাসের সাথে বাস্তবে ভুল বা বানানো তথ্য উপস্থাপন করার সমস্যা" — অর্থাৎ পুরোপুরি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল তথ্য দেওয়া — আজও একটা বড় সমস্যা, এবং এটা প্রযুক্তিগতভাবে এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস ওপেনএআই ও মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধে কপিরাইট লঙ্ঘনের মামলা করে, অভিযোগ ছিল মডেল প্রশিক্ষণে কোটি কোটি নিবন্ধ অনুমতি ছাড়াই ব্যবহৃত হয়েছে। মামলাটি এখনো চলমান, আর এর রায় গোটা শিল্পের জন্য একটা নজির তৈরি করবে।

তার চেয়েও বড় প্রশ্ন — চাকরির ভবিষ্যৎ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) ২০২৩ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেছিল, জেনারেটিভ এআইয়ের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রায় চল্লিশ কোটি চাকরি পুনর্গঠনের মুখে পড়বে। স্বস্তির খবর হলো, বেশিরভাগই সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হবে না, বদলে যাবে — কিন্তু ক্লার্কশিপ, সাধারণ কাস্টমার সাপোর্ট, এন্ট্রি-লেভেল কোডিং ও টেমপ্লেট-নির্ভর ডিজাইনের মতো ভূমিকায় যারা আছেন, তাদের জন্য এই "বদলে যাওয়া" শব্দটা যথেষ্ট স্বস্তিদায়ক নয়।

এরপর কী?

প্রথম চ্যাটজিপিটি ছিল শুধু লেখায় সীমাবদ্ধ। তিন বছরে এটি মাল্টিমোডালমাল্টিমোডাললেখা, ছবি, শব্দ ও ভিডিওর মতো একাধিক ধরনের তথ্য একসাথে বোঝা ও তৈরি করার সক্ষমতা হয়ে উঠেছে — ছবি বোঝে, ছবি তৈরি করে, ভয়েসে কথা বলে, ভিডিওর বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করে। ২০২৪-২৫ সালে ওপেনএআই, গুগল ডিপমাইন্ড ও অ্যানথ্রপিকের মধ্যে প্রতিযোগিতা সরে গেছে "রিজনিং মডেলরিজনিং মডেলউত্তর দেওয়ার আগে ধাপে ধাপে যুক্তি সাজিয়ে চিন্তা করে এমন এআই মডেল"-এর দিকে — যেগুলো উত্তর দেওয়ার আগে ধাপে ধাপে চিন্তা করে, গণিত ও কোডিং সমস্যায় আগের মডেলগুলোর চেয়ে অনেক এগিয়ে।

আমার মনে হয় পরবর্তী ঢেউটা হবে সবচেয়ে বড় — এজেন্টিক এআইএজেন্টিক এআইমানুষের সরাসরি নির্দেশনা ছাড়াই স্বাধীনভাবে ধাপে ধাপে কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম এআই ব্যবস্থা, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে একাধিক অ্যাপের মধ্যে কাজ করে পুরো কাজ শেষ করে দেবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ২০২৬-২৭ সালের মধ্যে এই এজেন্টগুলোই সাধারণ অফিস-কর্মপ্রবাহের বড় অংশ দখল করে নেবে। সেই দিন যত কাছে আসবে, প্রশ্নটাও ততই জরুরি হয়ে উঠবে।

তিন বছর আগে একটি টেক্সট বক্সে প্রশ্ন লিখে উত্তর পাওয়া ছিল নিছক কৌতূহল। আজ সেটি লক্ষ লক্ষ মানুষের দৈনন্দিন কাজের পরিকাঠামো। বাংলাদেশেও এখন প্রশ্নটা আর "এআই ব্যবহার করব কি না" নয় — প্রশ্ন হলো, কত দ্রুত এবং কতটা গভীরভাবে আমরা এর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারব। যারা এই প্রশ্নের উত্তর দেরিতে খুঁজবেন, তাদের জন্য সময়টা ক্রমেই কম হয়ে আসছে।