আপনার Gmail যখন নিজে থেকে একটা ইমেইলের খসড়া লিখে দেয়, বা Google Docs-এ কার্সার বসাতেই পুরো একটা প্যারাগ্রাফ ভেসে ওঠে — সেই মুহূর্তে ক'জন থামে ভাবতে যে এর পেছনে কাজ করছে জেমিনি (Gemini)? প্রশ্নটা তুলছি কারণ ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর গুগল যখন জেমিনি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করে, তখন এটাকে ধরা হয়েছিল চ্যাটজিপিটির জবাব হিসেবে। কিন্তু দুই বছর পর দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়, প্রশ্নটা তখনই ভুল জায়গায় করা হচ্ছিল।

মনে আছে তো, ২০২৩ সালের শুরুতে চ্যাটজিপিটির ঝড় সামলাতে গুগল কেমন তড়িঘড়ি করে Bard নামের একটা চ্যাটবট বাজারে এনেছিল? সেটা ছিল প্রায় আতঙ্কের প্রতিক্রিয়া। জেমিনি তার বিপরীত — এটা তাড়াহুড়োর অবসান, একটা পূর্ণাঙ্গ প্রতি-আক্রমণের সূচনা। লঞ্চেই মডেলটি এসেছিল তিন আকারে — Ultra (সর্বোচ্চ সক্ষমতা), Pro (ভারসাম্যপূর্ণ) এবং Nano (অন-ডিভাইস)। আর এর পেছনে যে দলটা কাজ করেছে, সেটাও তাৎপর্যপূর্ণ — ২০২৩ সালের এপ্রিলে গুগল ব্রেইন ও ডিপমাইন্ড একত্রিত হয়ে তৈরি করে ‘Google DeepMind’, যেটা সিইও সুন্দর পিচাইয়ের এআই-ফার্স্ট কৌশলের মূল স্তম্ভ হয়ে দাঁড়ায়। এটা নিছক একটা প্রোডাক্ট লঞ্চ ছিল না, ছিল গুগলের পুরো গবেষণা কাঠামোর পুনর্বিন্যাস।

১০ লক্ষ টোকেন মানে আসলে কী বদলে গেল?

২০২৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি গুগল যখন Gemini 1.5 Pro ঘোষণা করল, তখন সবচেয়ে চোখ কপালে তোলা ফিচারটা ছিল ১ মিলিয়ন টোকেনেরটোকেনেরএআই মডেল লেখাকে যেসব ছোট ছোট অংশে ভেঙে প্রক্রিয়া করে তার একক কনটেক্সট উইন্ডোকনটেক্সট উইন্ডোএকটি এআই মডেল এক নিঃশ্বাসে কতটুকু লেখা মনে রেখে প্রক্রিয়া করতে পারে তার সীমা — সেই সময় পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে বড়। সংখ্যাটা শুনতে বিমূর্ত লাগতে পারে, কিন্তু আমি এটাকে দেখি এভাবে: একটা পুরো বই, ঘণ্টাখানেকের ভিডিও, বা হাজার পাতার একটা কোডবেস — সবটা একসঙ্গে মডেলের সামনে রাখা যায়, কোনো কাটাছেঁড়া ছাড়াই। গবেষকরা একে বলছেন “লং-কনটেক্সট যুগ”-এর সূচনা, আর আমি বলব, এটাই ছিল প্রথমবার যখন মনে হয়েছিল গুগল সত্যিই চ্যাটজিপিটির চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে গেল — অন্তত ফিচারের দিক থেকে।

বার্ড কেন হারিয়ে গেল, আর ওয়ার্কস্পেসেই বা কী বদলাল?

মার্চ ২০২৪-এ গুগল Bard নামটাই তুলে দিল। পুরো চ্যাট অভিজ্ঞতা পুনর্নামকরণ হলো “Gemini”, আর এলো আলাদা আইওএস ও অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ। আমার কাছে এই সিদ্ধান্তটা যতটা না প্রযুক্তিগত, তার চেয়ে বেশি ব্র্যান্ডিং-এর স্বীকারোক্তি — Bard নামটা কখনোই মানুষের মনে জায়গা করে নিতে পারেনি। সত্যিকারের কৌশলগত চাল ছিল অন্য জায়গায়: Gmail, Docs, Sheets, Slides ও Meet-এ জেমিনি ঢুকিয়ে দেওয়া, Google One AI Premium সাবস্ক্রিপশনের মাধ্যমে মাসিক ২০ ডলারে। যেসব প্রতিষ্ঠান আগে থেকেই Google Workspace ব্যবহার করত, তাদের কাছে এটা নতুন কোনো টুল শেখার ঝামেলা ছিল না — বিদ্যমান অভ্যাসের ভেতরেই এআই ঢুকে পড়ল। এটাই সম্ভবত গুগলের সবচেয়ে চতুর চাল।

এজেন্টিক এআইএজেন্টিক এআইপ্রশ্নের উত্তর দেওয়ার বদলে নিজে থেকে একাধিক ধাপে কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম এআই ব্যবস্থা-এর দিকে ঝুঁকল কেন জেমিনি?

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে উন্মোচিত Gemini 2.0 Flash-এর সঙ্গে এল “Deep Research” নামের এজেন্টিক সামর্থ্য — যেখানে একটা প্রশ্ন দিলে মডেল নিজে থেকে বহু উৎস থেকে তথ্য খুঁজে এনে একটা কাঠামোবদ্ধ প্রতিবেদন বানিয়ে দেয়। একই সঙ্গে এটা মাল্টিমোডালমাল্টিমোডালটেক্সট, ছবি, অডিওর মতো একাধিক ধরনের তথ্য একসঙ্গে বুঝতে ও তৈরি করতে সক্ষম আউটপুট দিতে পারে — টেক্সটের সঙ্গে ছবি, চার্ট, এমনকি টুল-কলের ফলাফলও। আমার মনে হয় এটাই এআই দৌড়ের পরের ধাপ: প্রশ্নের উত্তর দেওয়া থেকে সরে গিয়ে নিজে থেকে কাজ সম্পন্ন করা। জেমিনি ফ্ল্যাশের মাধ্যমে গুগল বলতে চাইছে, চ্যাটবট যুগ শেষ হয়ে আসছে।

ফোনের ভেতরের এআই — জেমিনি ন্যানো কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

গুগলের সবচেয়ে সাহসী বাজি বোধহয় Gemini Nano — অন-ডিভাইস এআই মডেল, যা প্রথম যুক্ত হয় Pixel 8 Pro-তে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে, পরে আসে স্যামসাং Galaxy S24 সিরিজে। টেক্সট সামারাইজেশন, স্মার্ট রিপ্লাই, ভয়েস রেকর্ডার ট্রান্সক্রিপ্ট — এসব কাজ ফোন অফলাইনে থাকলেও চলে। বড় ক্লাউড সংস্থাগুলোর মধ্যে গুগলই প্রথম বড় আকারে অন-ডিভাইস LLMLLMবিপুল পরিমাণ লেখা দিয়ে প্রশিক্ষিত বড় ভাষা মডেল যা মানুষের ভাষা বুঝে ও তৈরি করে বাজারে আনল, আর এটা আমার চোখে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ইন্টারনেট-নির্ভরতা ছাড়াই এআই ব্যবহার করা — বিশেষ করে যেসব জায়গায় নেটওয়ার্ক অস্থির, সেখানে এটাই আসল সমাধান।

ChatGPT এখনো ‘ভার্ব’, জেমিনি কেন নয়?

জেমিনির ফিচার-তালিকা চমকপ্রদ, কিন্তু সত্যি কথা বলতে, কনজিউমার ধারণায় চ্যাটজিপিটি এখনো এগিয়ে। দৈনন্দিন কথাবার্তায় ‘ChatGPT-তে জিজ্ঞেস করো’ এখনো সর্বজনীন — এই যে একটা প্রোডাক্টের নাম ক্রিয়াপদ হয়ে ওঠা, সেটা বিশাল একটা সুবিধা, আর গুগল সেটা এখনো অর্জন করতে পারেনি। তবে এন্টারপ্রাইজে হিসাবটা উল্টো — অ্যান্ড্রয়েড ইকোসিস্টেম আর Google Workspace ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য জেমিনি প্রায় অনিবার্য পছন্দ। আমার বিশ্লেষণ হলো, এই দুই বাজারে দুটো ভিন্ন যুদ্ধ চলছে, আর গুগল ইচ্ছাকৃতভাবেই কনজিউমার যুদ্ধ ছেড়ে এন্টারপ্রাইজে মনোযোগ দিয়েছে — কারণ সেখানেই দীর্ঘমেয়াদী রাজস্ব।

বাংলাদেশে জেমিনি কতটা বাস্তব?

আমাদের দেশের বড় কর্পোরেট, বিশ্ববিদ্যালয় ও এনজিও-র অনেকেই বহু বছর ধরে Google Workspace ব্যবহার করছে। তাই জেমিনি তাদের কাছে নতুন কোনো সাবস্ক্রিপশনের বোঝা নয় — বিদ্যমান টুলের এআই-সংস্করণ মাত্র। ঢাকা ও চট্টগ্রামের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যে ছাত্রছাত্রীদের Google Workspace for Education-এর আওতায় জেমিনি অ্যাক্সেস দিয়ে দিয়েছে, যেটা আমি মনে করি সঠিক দিকে একটা পদক্ষেপ।

তবে বাংলা ভাষায় জেমিনির পারফরম্যান্স নিয়ে আমার পর্যবেক্ষণ মিশ্র:

  • বাংলা-ইংরেজি মিশ্র প্রম্পট ভালোই বোঝে — এটা প্রশংসার যোগ্য
  • আনুষ্ঠানিক লেখায় হ্যালুসিনেশনহ্যালুসিনেশনএআই মডেল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল বা বানানো তথ্য সঠিক বলে উপস্থাপন করার সমস্যা কম, কিন্তু গ্রামীণ প্রসঙ্গে ভুল বেশি — অর্থাৎ শহুরে বাংলায় ভালো, প্রান্তিক বাস্তবতায় দুর্বল
  • ভয়েস ইনপুট বাংলায় এখনো চ্যাটজিপিটির চেয়ে কম নির্ভুল

এই তিনটি পয়েন্ট মিলিয়ে আমার সিদ্ধান্ত হলো — জেমিনি বাংলাকে ‘সাপোর্ট করে’, কিন্তু বাংলাকে এখনো প্রথম-শ্রেণির ভাষা হিসেবে বিবেচনা করে না।

দুই বছরে জেমিনি একটা জিনিস প্রমাণ করেছে — গুগল এআই দৌড় ছেড়ে দেয়নি, বরং নিজের শর্তে লড়াইটা নতুন করে সাজিয়েছে। কিন্তু আমার কাছে প্রকৃত জয় তখনই আসবে, যখন বাংলাদেশের মতো বহু-ভাষিক বাজারে এটা কেবল ইংরেজিতে নয়, প্রতিটি স্থানীয় ভাষায় সমানভাবে নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠবে। ততদিন পর্যন্ত, প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে থাকলেও, জেমিনির লড়াইটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।