গত ১৯ মে গুগল আই/ও সম্মেলনে গুগল জানাল, তাদের সার্চ বক্সে ২৫ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসছে। গুগলের সার্চ প্রধান লিজ রিডের ঘোষণার পর টেকক্রাঞ্চ শিরোনাম করল, আপনি যে গুগল সার্চ চিনতেন সেটি শেষ। কথাটি কিছুটা নাটকীয়, তবে পুরোপুরি অকারণ নয়।

একটি ভুল ধারণা শুরুতেই সরিয়ে রাখা ভালো। কিছু আলোচনায় বলা হচ্ছে, গুগল এআই মোডকে সবার জন্য ডিফল্ট করে দিয়েছে। টেকক্রাঞ্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী গুগল নিজেই বলছে, এআই মোড ডিফল্ট অভিজ্ঞতা নয়। সাধারণ সার্চ ফলাফল আছে, লিংকও আছে। তবে সার্চের নকশা এমনভাবে বদলাচ্ছে যে অনেক প্রশ্নে ব্যবহারকারী লিংকের চেয়ে এআই কথোপকথনের দিকেই বেশি এগোবেন। আসল গল্পটি এখানেই।

দুটি শব্দ পরিষ্কার করে নেওয়া যাক। এআই ওভারভিউ হলো সাধারণ সার্চ ফলাফলের ওপরে দেখানো এআই সারাংশ। আর এআই মোড হলো আলাদা কথোপকথনধর্মী সার্চ, যেখানে আপনি পরপর প্রশ্ন করে যেতে পারেন। এতদিন এই দুটি অনেকটা আলাদা ছিল। এবারের বড় পরিবর্তন হলো, দুটিকে এক প্রবাহে জুড়ে দেওয়া।

গুগল কেন এত জোর দিচ্ছে, তার একটি প্রসঙ্গও আছে। টেকক্রাঞ্চের উল্লেখ করা হিসাবে ২০২৬ সালের শুরুতে চ্যাটজিপিটির সাপ্তাহিক সক্রিয় ব্যবহারকারী ছিল প্রায় ৯০ কোটি। মানুষ প্রশ্ন করার নতুন জায়গা পেয়ে গেছে, আর সার্চ গুগলের ব্যবসার কেন্দ্র। এই প্রেক্ষাপট আমাদের ব্যাখ্যা, তবে সার্চে এআই আনার গতি বুঝতে এটি সাহায্য করে।

আসলে কী কী বদলাল

গুগলের নিজের ঘোষণা থেকে মূল পরিবর্তনগুলো এক জায়গায় রাখা যাক।

  • নতুন সার্চ বক্স: লম্বা প্রশ্নে বক্সটি বড় হয়, এআই প্রশ্নের পরামর্শ দেয়, আর লেখার পাশাপাশি ছবি, ফাইল, ভিডিও ও ক্রোম ট্যাবও গ্রহণ করে। এআই মোড যেসব দেশ ও ভাষায় আছে, সেখানে এটি চালু হচ্ছে।
  • ফলো-আপ প্রশ্ন: এআই ওভারভিউ থেকেই পরের প্রশ্ন করে সরাসরি এআই মোডের কথোপকথনে যাওয়া যাবে। এটি ডেস্কটপ ও মোবাইলে বিশ্বজুড়ে চালু হয়েছে।
  • নতুন মডেল: এআই মোডে ডিফল্ট মডেল হিসেবে এসেছে জেমিনি ৩.৫ ফ্ল্যাশ।
  • জেনারেটিভ ইউআই: প্রশ্ন অনুযায়ী সার্চ নিজেই টেবিল, গ্রাফ বা সিমুলেশন বানাবে। এই গ্রীষ্মে সবার জন্য বিনামূল্যে আসার কথা। পরে যুক্তরাষ্ট্রে পেইড গ্রাহকেরা নিজের মতো ছোট অ্যাপও বানাতে পারবেন।
  • এজেন্টিক বুকিং: স্থানীয় সেবা খুঁজে সরাসরি বুকিংয়ের লিংক দেওয়া, কিছু ক্ষেত্রে আপনার হয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ফোন করা। আপাতত এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য।
  • ইনফরমেশন এজেন্ট: ব্লগ, সংবাদ সাইট ও সোশ্যাল পোস্ট নজরে রেখে পেছন থেকে আপনাকে হালনাগাদ জানাবে। প্রথমে পাবেন গুগল এআই প্রো ও আল্ট্রা গ্রাহকেরা।
  • পার্সোনাল ইন্টেলিজেন্স: জিমেইল ও গুগল ফটোজ যুক্ত করে ব্যক্তিগত উত্তর পাওয়ার সুবিধা, যা প্রায় ২০০ দেশ ও অঞ্চলে ৯৮টি ভাষায় বিনা সাবস্ক্রিপশনে ছড়াচ্ছে।

সংখ্যার দিক থেকেও এটি আর পরীক্ষা নয়। গুগলের হিসাবে এআই মোডের মাসিক ব্যবহারকারী ১০০ কোটি ছাড়িয়েছে। টেকক্রাঞ্চ জানিয়েছে, এআই ওভারভিউ ব্যবহার করেন মাসে ২৫০ কোটির বেশি মানুষ।

প্রকাশকের জন্য দুশ্চিন্তা কোথায়

ওয়েবের পুরনো চুক্তিটি ছিল সরল। প্রকাশক লিখবেন, গুগল সেই লেখা দেখাবে, পাঠক ক্লিক করে সাইটে যাবেন। উত্তর যদি সার্চের পাতাতেই মিলে যায়, তাহলে এই চক্রের শেষ ধাপটি দুর্বল হয়ে পড়ে।

এর পক্ষে কিছু তথ্যও আছে। পিউ রিসার্চ সেন্টার ২০২৫ সালের মার্চে ৯০০ মার্কিন প্রাপ্তবয়স্কের ব্রাউজিং তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছিল, যেসব সার্চে এআই সারাংশ ছিল সেখানে সাধারণ লিংকে ক্লিক হয়েছে ৮ শতাংশ ক্ষেত্রে, আর সারাংশ না থাকলে ১৫ শতাংশ ক্ষেত্রে। সারাংশের ভেতরের লিংকে ক্লিক হয়েছে মাত্র ১ শতাংশ ক্ষেত্রে। এআই সারাংশের পাতায় সেখানেই ব্রাউজিং শেষ করার হারও ছিল বেশি, ২৬ শতাংশ বনাম ১৬ শতাংশ। গবেষণাটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের এবং এক বছরের বেশি পুরনো, তাই বাংলাদেশের জন্য একে সরাসরি প্রযোজ্য ধরা ঠিক হবে না, তবে প্রবণতা বোঝার জন্য এটি কাজের।

রয়টার্স ইনস্টিটিউটের জানুয়ারির প্রতিবেদনে চার্টবিটের ২,৫০০টির বেশি সংবাদ সাইটের তথ্য ব্যবহার করা হয়। সেখানে দেখা যায়, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বরে গুগল সার্চ থেকে আসা ট্রাফিক ৩৩ শতাংশ কমেছে, আর গুগল ডিসকভার থেকে আসা ট্রাফিক কমেছে ২১ শতাংশ। ৫১ দেশের ২৮০ জন গণমাধ্যম নেতা আশা করছেন, আগামী তিন বছরে সার্চ ট্রাফিক ৪০ শতাংশের বেশি কমবে। এটি তাঁদের অনুমান, প্রমাণিত ফল নয়, আর ট্রাফিক কমার পেছনে একমাত্র কারণ এআই কি না, তাও এই সংখ্যা একা বলে না।

গুগল এই ছবির সঙ্গে একমত নয়। ২০২৫ সালের আগস্টে লিজ রিড লিখেছিলেন, গুগল থেকে ওয়েবসাইটে যাওয়া অর্গানিক ক্লিক বছরের ব্যবধানে মোটামুটি স্থিতিশীল। তাঁর দাবি, বাইরের অনেক প্রতিবেদনের পদ্ধতিতে ত্রুটি আছে এবং ট্রাফিক কিছু সাইট থেকে অন্য সাইটে সরছে। তবে এগুলো গুগলের নিজের দাবি, এবং সেই লেখায় মূল তথ্য বা পদ্ধতি প্রকাশ করা হয়নি। আই/ও-র ঘোষণায় প্রকাশকদের ট্রাফিক বা ক্ষতিপূরণের কোনো হিসাবও নেই, শুধু বলা হয়েছে কথোপকথন যত গভীর হবে, লিংক ও সহায়ক লেখা তত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে। টেকক্রাঞ্চের ধারণা, প্রকাশকদের কাছে গুগলের রেফারেল আরও কমবে।

পাঠক হিসেবে আপনার লাভ ও ঝুঁকি

লাভের দিকটি বাস্তব। জটিল প্রশ্ন স্বাভাবিক ভাষায় করা যাবে, ছবি বা ফাইল দিয়ে জিজ্ঞেস করা যাবে, দশটি ট্যাব ঘাঁটার দরকার কমবে। কোনো জিনিস তুলনা করতে বা কোনো ধারণা বুঝতে এটি সত্যিই সময় বাঁচাতে পারে।

কিন্তু আমাদের মতে, তিনটি অভ্যাস এখন আগের চেয়ে জরুরি।

  • মূল সূত্র খুলে দেখুন। এআই সারাংশ হলো কারও লেখা তথ্যের সংক্ষিপ্ত রূপ। স্বাস্থ্য, আইন, টাকা বা পরীক্ষার তথ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মূল পাতা না পড়ে সিদ্ধান্ত নেবেন না।
  • নিজের তথ্য নিয়ে ভাবুন। পার্সোনাল ইন্টেলিজেন্সে জিমেইল বা ফটোজ যুক্ত করবেন কি না, তা আপনার সিদ্ধান্ত। সুবিধার সঙ্গে কতটা ব্যক্তিগত তথ্য দিচ্ছেন, তা বুঝে নিন।
  • নিজের চিন্তা বাঁচিয়ে রাখুন। শেখার সময় সরাসরি উত্তর পাওয়া সহজ, কিন্তু নিজে খুঁজে মিলিয়ে দেখার অভ্যাসই দীর্ঘদিনের দক্ষতা তৈরি করে।

আরেকটি বিষয় লক্ষ করার মতো। ইনফরমেশন এজেন্টের মতো সুবিধা প্রথমে আসছে পেইড গ্রাহকদের কাছে। সার্চ যদি ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত সহকারীতে রূপ নেয়, তাহলে বিনামূল্যের আর পেইড অভিজ্ঞতার ব্যবধান কতটা বাড়ে, সেটিও দেখার বিষয়।

বাংলা পাঠক ও বাংলাদেশের প্রকাশকদের জন্য

বাংলা এই আলোচনার বাইরে নয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে গুগল ভারতে এআই মোডে বাংলাসহ সাতটি ভারতীয় ভাষা যুক্ত করে, আর একই সঙ্গে ৩৫টির বেশি নতুন ভাষা ও ৪০টি নতুন দেশ ও অঞ্চলে সম্প্রসারণের কথা জানায়। তবে আই/ও-র ঘোষণায় বাংলাদেশের আলাদা উল্লেখ নেই। কোন সুবিধা এখানে কবে পাওয়া যাবে, তা নিজের ফোনে দেখে নেওয়াই ভালো।

বাংলাদেশি সংবাদ সাইট বা ব্লগের ট্রাফিকে এর প্রভাব নিয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান আমরা পাইনি, তাই অনুমান করে সংখ্যা বলছি না। তবে আপনি যদি ব্লগ, শিক্ষামূলক সাইট বা ছোট প্রকাশনা চালান, কিছু প্রস্তুতি এখনই নেওয়া যায়। এগুলো আমাদের মত, নিশ্চিত সূত্র নয়।

  • এমন লেখায় জোর দিন যা সারাংশে শেষ হয় না: নিজস্ব অনুসন্ধান, স্থানীয় তথ্য, বাস্তব অভিজ্ঞতা, হাতে-কলমে উদাহরণ। গুগল নিজেও বলেছে, প্রথম হাতের দৃষ্টিভঙ্গি আছে এমন সাইটগুলো ট্রাফিক পাচ্ছে।
  • পাঠকের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক গড়ুন, যেমন নিউজলেটার, যাতে একটি মাত্র প্ল্যাটফর্মের ওপর ভর করতে না হয়।
  • ট্রাফিকের হিসাব নিয়মিত দেখুন। কোন ধরনের পাতায় ক্লিক কমছে, তা না জানলে কৌশলও ঠিক করা যায় না।

সার্চ বদলাচ্ছে, তবে এক রাতে শেষ হয়ে যাচ্ছে না। আপনি পাঠক হন বা প্রকাশক, সবচেয়ে ভালো প্রস্তুতি একই: কোন তথ্য কোথা থেকে আসছে, সেই প্রশ্নটি করতে থাকা।

সূত্র