ধরুন আপনি একজন গবেষক, বাংলা ভাষার জন্য একটা এআই মডেল বানাতে চান, কিন্তু প্রতিটা এপিআই কলে খরচ হচ্ছে ডলার, আর আপনার ডেটা চলে যাচ্ছে সুদূর কোনো সার্ভারে। ২০২৩ সালের আগে এই সমস্যাটাই ছিল বিশ্বজুড়ে অসংখ্য গবেষকের বাস্তবতা। ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ মেটা (তৎকালীন ফেসবুক) নীরবে প্রকাশ করে LLaMA (Large Language Model Meta AI)-এর প্রথম সংস্করণ — তখনো এটা শুধু গবেষণা-লাইসেন্সে বিতরণ করা হচ্ছিল, ৭ বিলিয়ন, ১৩ বিলিয়ন, ৩৩ বিলিয়ন ও ৬৫ বিলিয়ন প্যারামিটারেরপ্যারামিটারেরমডেলের ভেতরের সমন্বয়যোগ্য সংখ্যাগত মান, যার পরিমাণ মডেলের আকার ও শেখার ক্ষমতা নির্দেশ করে চারটা আকারে। কিন্তু মার্চের প্রথম দিকেই 4chan টরেন্টের মাধ্যমে মডেল-ওয়েটগুলো প্রকাশ্যে ফাঁস হয়ে যায়। মেটা হয়তো এই ফাঁসকে বিব্রতকর ঘটনা বলে ভেবেছিল সেদিন, কিন্তু ইতিহাস বলছে, সেই মুহূর্তটাই ছিল ওপেন-সোর্স এআইয়ের দৃশ্যপট বদলে যাওয়ার শুরু।

ফাঁসের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের Alpaca, LMSYS-এর Vicuna-সহ ডজনখানেক ফাইন-টিউনফাইন-টিউনএকটি পূর্ব-প্রশিক্ষিত মডেলকে নির্দিষ্ট কাজ বা ডেটাসেটে বাড়তি প্রশিক্ষণ দিয়ে খাপ খাওয়ানোর প্রক্রিয়া সংস্করণ বেরিয়ে আসে। মেটা এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয় — সেই জোয়ারকে বাধা দেওয়ার বদলে আলিঙ্গন করে। ১৮ জুলাই ২০২৩ তারা প্রকাশ করে LLaMA 2, এবার বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতিসহ (৭বি, ১৩বি ও ৭০বি)। এই একটা সিদ্ধান্তই বলে দেয়, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার একটা পথ হলো প্রতিযোগীকে আটকে রাখা, আর আরেকটা পথ হলো তাকে নিজের সঙ্গে জুড়ে নেওয়া। মেটা দ্বিতীয় পথটা বেছে নিয়েছিল, আর সেটাই কাজে দিয়েছে।

লামা ৩ কি সত্যিই "ফ্রন্টিয়ার" মডেলের কাতারে পৌঁছাতে পেরেছিল?

২০২৪ সালের ১৮ এপ্রিল আসে LLaMA 3 (৮বি ও ৭০বি)। মাত্র তিন মাস পরে, ২৩ জুলাই, মেটা উন্মোচন করে LLaMA 3.1 405B — এটাই ছিল প্রথম ফ্রন্টিয়ার-শ্রেণিরফ্রন্টিয়ার-শ্রেণিরসবচেয়ে উন্নত, সাম্প্রতিকতম প্রযুক্তির সীমানায় থাকা শীর্ষমানের এআই মডেল ওপেন-ওয়েটওপেন-ওয়েটমডেলের ভেতরের প্রশিক্ষিত সংখ্যাগত মান (ওয়েট) প্রকাশ্যে ডাউনলোড ও ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া, তবে প্রশিক্ষণ ডেটা বা কোড নয় মডেল, যা বেঞ্চমার্কেবেঞ্চমার্কেএকাধিক এআই মডেলের কর্মক্ষমতা তুলনা করার জন্য ব্যবহৃত মানসম্মত পরীক্ষা GPT-4-এর সঙ্গে পাল্লা দিয়েছে। উত্তরটা তাই স্পষ্ট — হ্যাঁ, পেরেছিল। আর সেই দিন থেকেই একটা পুরনো ধারণা ভেঙে পড়ে: অত্যাধুনিক এআই আর বিগ-টেকের একচেটিয়া বাক্সে বন্দি নয়।

মার্ক জাকারবার্গ তাঁর প্রকাশ্য চিঠিতে লিখেছিলেন, "ওপেন সোর্স এআই-ই সামনে এগোনোর পথ।" তাঁর যুক্তিটা আমার কাছে বেশ যুক্তিসংগত মনে হয় — একটা একক কোম্পানির হাতে ফ্রন্টিয়ার মডেলের নিয়ন্ত্রণ থাকলে দীর্ঘমেয়াদে তা উদ্ভাবন ও নিরাপত্তা, দুটোর জন্যই ক্ষতিকর। ক্ষমতা যত কেন্দ্রীভূত হয়, ভুল করার সুযোগও তত বাড়ে, আর সেই ভুলের দায় তখন গোটা বিশ্বকে বহন করতে হয়।

হাগিং ফেস কীভাবে ওপেন এআইয়ের "গিটহাব" হয়ে উঠল?

লামার উন্মোচন Hugging Face-কে পরিণত করেছে ওপেন এআই মডেলের কেন্দ্রীয় ভান্ডারে। প্ল্যাটফর্মটিতে এখন পাঁচ লক্ষেরও বেশি মডেল হোস্ট করা আছে, যার বিশাল অংশই লামা-ভিত্তিক বা লামা থেকে অনুপ্রাণিত আর্কিটেকচারে তৈরি। গবেষক ও স্টার্টআপরা নিজস্ব ডেটাসেট দিয়ে লামা ফাইন-টিউন করে নির্দিষ্ট টাস্কের জন্য ছোট, দ্রুত ও সস্তা মডেল বানাচ্ছেন। একটা মডেল থেকে হাজারো মডেলের জন্ম — এটাই বোধহয় ওপেন-সোর্স ইকোসিস্টেমের আসল শক্তি।

বন্ধ বনাম খোলা — কোন পথে এগোবে ভবিষ্যৎ?

২০২৪-২৫ সালের এআই শিল্পে দুটো অক্ষ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে বন্ধ (closed) প্লেয়ার — ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক ও আংশিকভাবে গুগল; অন্যদিকে খোলা (open) প্লেয়ার — মেটার লামা, মিস্ট্রাল (ফ্রান্স), আলিবাবার কিউয়েন (Qwen) এবং ডিপসিক (DeepSeek)। ডিপসিকের R1 রিজনিং মডেল ২০২৫ সালে প্রমাণ করেছে যে অনেক কম খরচেও ফ্রন্টিয়ার-কাছাকাছি ফল পাওয়া সম্ভব — আর সেই সম্ভাবনার দরজাটা প্রথম খুলে দিয়েছিল লামাই। এই প্রতিযোগিতা যত তীব্র হবে, ততই লাভ হবে আমাদের মতো গবেষকদের, যারা বড় বাজেট ছাড়াই ভালো মডেল ব্যবহার করতে চান।

আমাদের গবেষকদের জন্য এর মানে আসলে কী?

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষকদের জন্য লামা একটা সত্যিকারের পরিবর্তন এনেছে। আগে বাংলা NLP-র কাজ করতে হলে ওপেনএআইয়ের এপিআই কল করে ডলার খরচ করতে হতো — একটা সীমাবদ্ধতা যা অনেক প্রতিভাবান গবেষককেই থামিয়ে দিত। এখন বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইউআইইউ ও নর্থ সাউথের ল্যাবগুলোয় লামা ফাইন-টিউন করে বাংলা সেন্টিমেন্ট অ্যানালাইসিস, নামড এনটিটি রিকগনিশন এবং বাংলা-ইংরেজি অনুবাদ মডেল তৈরি হচ্ছে — নিজেদের GPU-তে, কোনো ডেটা বাইরে না পাঠিয়ে। আমার কাছে এটা শুধু একটা কারিগরি সুবিধা নয়, একটা স্বাধীনতার প্রশ্নও।

এই সুবিধা কেন গুরুত্বপূর্ণ, সেটা তিনটা দিক থেকে বোঝা যায়:

  • ডেটা সার্বভৌমত্বডেটা সার্বভৌমত্বদেশের নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের ডেটা নিজ দেশের অবকাঠামোয় সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণে রাখার নীতি — সংবেদনশীল বাংলা টেক্সট দেশের বাইরে যায় না
  • খরচ — প্রতি টোকেনের এপিআই বিল নেই, বিশ্ববিদ্যালয়-বাজেটে চালানো সম্ভব
  • পাঠ্যক্রম — শিক্ষার্থীরা কেবল ব্যবহারকারী নয়, মডেলের ভেতরে কাজ করে শিখছেন

এই তিনটা মিলিয়েই তৈরি হচ্ছে একটা প্রজন্ম, যারা এআই শুধু ব্যবহার করে না, বোঝে।

"ওপেন" শব্দটা কি পুরোপুরি সত্য?

সব প্রশংসা সত্ত্বেও একটা কথা স্পষ্ট করে বলা দরকার — লামা প্রকৃত অর্থে "ওপেন সোর্স" নয়, এটা "ওপেন-ওয়েট"। প্রশিক্ষণ ডেটা এবং পূর্ণ পাইপলাইন এখনো প্রকাশিত হয়নি, আর লাইসেন্সে কিছু ব্যবহার-সীমাবদ্ধতাও রয়েছে — যেমন ৭০ কোটি মাসিক ব্যবহারকারীর বেশি পণ্যে বিনা-অনুমতিতে ব্যবহার করা যায় না। এই সীমাবদ্ধতাগুলো মনে রাখা জরুরি, নইলে আমরা "ওপেন" শব্দটাকে বাস্তবের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করে বসব। তবু, আগের পুরোপুরি বন্ধ মডেলগুলোর তুলনায় এটা নিঃসন্দেহে বিশাল অগ্রগতি।

দুই বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে একটা ফাঁস হওয়া মডেল গোটা শিল্পের দিকনির্দেশনা পাল্টে দিয়েছে — এই ঘটনাটাই প্রমাণ করে প্রযুক্তির জগতে পরিকল্পনার চেয়ে দুর্ঘটনা কতটা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের তরুণ গবেষকের সামনে এখন আর প্রশ্ন নয় যে এআই গবেষণা করবেন কি না — প্রশ্ন হলো, লামা ও তার উত্তরসূরিদের কাজে লাগিয়ে বাংলা ভাষার জন্য কত দ্রুত নিজের মডেল তৈরি করতে পারবেন।